একজন আরেকজনকে জান্নাতি জাহান্নামি বলতে পারবে কি।দলিল দেখুন


অন্যের জান্নাত-জাহান্নাম নির্ধারণের আমরা কে? ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর প্রজ্ঞা ও বর্তমান সমাজের একাল-সেকাল


একজন আরেকজনকে  জান্নাতি জাহান্নামি বলতে পারবে কি।দলিল দেখুন


নাহমাদুহু ওয়া নুসল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম -আম্মা বা’দ।

​ইসলামের ইতিহাসে ইমামে আজম আবু হানিফা (রহ.)-এর নাম প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা এবং ফিকহী গভীরতার এক অনন্য প্রতীক। তিনি কেবল একজন আইনজ্ঞই ছিলেন না, বরং মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং আল্লাহর রহমতের সীমানা সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ছিল অপরিসীম। তাঁর জীবনের একটি বিখ্যাত ঘটনা আজ আমাদের সমাজের জন্য এক মস্ত বড় শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে আমরা খুব সহজেই মানুষকে জান্নাত বা জাহান্নামের সার্টিফিকেট দিয়ে ফেলি।

ঐতিহাসিক ঘটনা: মদপানকারী ও আত্মহত্যাকারীর জানাজা

​একই সময়ে সমাজে দুটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল। এক ব্যক্তি অতিরিক্ত মদ পান করার কারণে মারা গেল, যা ইসলামে একটি বড় গুনাহ বা কবিরা গুনাহ। আর একই সময়ে এক নারী নিজের জীবন নিজে শেষ করে দিল অর্থাৎ আত্মহত্যা করল, যা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত জঘন্য এবং বড় পাপ। কাকতালীয়ভাবে, তাদের দু’জনের জানাজা একই সময়ে, একই মসজিদে অনুষ্ঠিত হওয়ার জন্য আনা হলো।

​সেখানে উপস্থিত সাধারণ মানুষ এবং কিছু অতি-উৎসাহী লোক ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-কে ঘিরে ধরল। তারা জিজ্ঞেস করল:

"হে ইমাম! এই দুই ব্যক্তির শেষ পরিণতি কী হবে? তারা কি জান্নাতে যাবে নাকি তাদের চিরস্থায়ী ঠিকানা হবে জাহান্নাম?"


ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর প্রজ্ঞাপূর্ণ অবস্থান

​তৎকালীন সময়ে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) চাইলে মানুষকে উত্তেজিত করে তুলতে পারতেন। তিনি মদপানের ভয়াবহতা এবং আত্মহত্যার শাস্তির কঠিন কঠিন আয়াত ও হাদিস বর্ণনা করে তাদের জাহান্নামী বলে ঘোষণা দিতে পারতেন। মানুষকে নানা ফিতনা ও ফ্যাসাদে জড়িয়ে রাখতে পারতেন। কারণ বাহ্যিকভাবে দু’জনই বড় পাপী অবস্থায় মারা গেছে।

​কিন্তু আল্লাহ তাআলা যাঁকে প্রজ্ঞা দিয়েছেন, তিনি কখনো আল্লাহর সীমানায় হস্তক্ষেপ করেন না। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) খুব ভালো করেই জানতেন যে, মানুষের শেষ পরিণতি বা নিয়তের বিচারক তিনি নন। তাঁর কাছে জান্নাত খোলার চাবি কিংবা জাহান্নাম বন্ধ করার তালা একটাও নেই। তিনি নিজেকে স্রষ্টার আসনে বসাননি।

​তাই তিনি সাধারণ মানুষের মতো হুজুগে ফয়সালা না দিয়ে, পবিত্র কোরআনে বর্ণিত আল্লাহর তিনজন মহান নবীর বাণী দিয়ে উত্তর দিলেন:

১. হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর বাণী দিয়ে উত্তর:

​তিনি বললেন, আমি তাদের ব্যাপারে সেই কথাই বলি যা আদি পিতা ইবরাহিম (আ.) বলেছিলেন:

فَمَن تَبِعَنِي فَإِنَّهُ مِنِّي ۖ وَمَنْ عَصَانِي فَإِنَّكَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

​"যে আমার অনুসরণ করে, সে আমার অন্তর্ভুক্ত। আর যে আমার অবাধ্য হয়, নিশ্চয়ই আপনি (আমার রব) পরম ক্ষমাশীল এবং দয়ালু।" (সূরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৩৬)


২. হযরত ঈসা (আ.)-এর বাণী দিয়ে উত্তর:

​এরপর তিনি বললেন, আমি তাদের ব্যাপারে সেই কথাই বলি যা ঈসা (আ.) তাঁর উম্মতের পাপিষ্ঠদের ব্যাপারে আল্লাহকে বলেছিলেন:

إِن تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ ۖ وَإِن تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ

​"আপনি যদি তাদের শাস্তি দেন, তারা তো আপনারই বান্দা। আর যদি আপনি তাদের ক্ষমা করেন, তবে নিশ্চয়ই আপনি পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়।" (সূরা মায়েদাহ, আয়াত: ১১৮)


৩. হযরত নূহ (আ.)-এর বাণী দিয়ে উত্তর:

​সবশেষে তিনি বললেন, আমি তাদের শেষ পরিণতি আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়ে নূহ (আ.)-এর সেই ঐতিহাসিক বাণী স্মরণ করিয়ে দিতে চাই:

قَالَ وَمَا عِلْمِي بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ * إِنْ حِسَابُهُمْ إِلَّا عَلَىٰ رَبِّي ۖ لَوْ تَشْعُرُونَ

​"তিনি বললেন, তারা কী কাজ করছিল তা জানা আমার কাজ নয়। তাদের সব হিসাব তো আমার রবের কাছেই আছে; যদি তোমরা বুঝতে পারো।" (সূরা শুআরা, আয়াত: ১১২-১১৩)


​এইভাবে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) অত্যন্ত প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে বিষয়টি আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিলেন এবং নিজের অবস্থানকে শুধু একজন সাধারণ বান্দার সীমার মধ্যে রাখলেন। তিনি আল্লাহর রহমতের দরজাও বন্ধ করেননি, আবার পাপকে প্রশ্রয়ও দেননি।

বর্তমান সমাজ ও আমাদের বড় পরীক্ষা

​আজকের দিনে আমাদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হলো— আমরা খুব দ্রুত অন্যের বিচারক (Judge) হয়ে যাই। সুযোগ পেলেই আমরা মানুষের আমলনামা নিয়ে বসে পড়ি এবং নিজেদের ইচ্ছামতো জান্নাত ও জাহান্নাম বণ্টন করতে শুরু করি। মনে হয় যেন আমরাই আল্লাহর রহমতের একমাত্র অভিভাবক বা পাহারাদার!

​সোশ্যাল মিডিয়া বা বাস্তব জীবনে কোনো মানুষ কোনো পাপে লিপ্ত হয়ে মারা গেলে বা কোনো দুর্ঘটনায় পড়লে, আমরা তার অতীত আমল না জেনেই তাকে সরাসরি দোযখে পাঠিয়ে দিই। অথচ আমরা জানি না, মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে ওই বান্দা আল্লাহর কাছে কেমন খাঁটি তওবা করেছিল।

সমালোচনা বনাম চূড়ান্ত ফয়সালা: আমাদের সীমা কোথায়?

​ইসলামে কোনো অন্যায় কাজ বা ভুল চিন্তার গঠনমূলক সমালোচনা করার অধিকার মানুষের আছে। সামাজিকভাবে অন্যায়কে অন্যায় এবং পাপকে পাপ বলা আমাদের দায়িত্ব। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি সম্পর্কে এই চূড়ান্ত ফয়সালা বা ডিক্রি দেওয়ার অধিকার পৃথিবীর কোনো মানুষের নেই যে— "সে নিশ্চিত জাহান্নামী" কিংবা "সে নিশ্চিত জান্নাতী"

​কারণ জান্নাত ও জাহান্নামের একমাত্র মালিক আল্লাহ তাআলা। তিনি তাঁর বান্দাদের প্রতি পৃথিবীর যেকোনো মায়ের চেয়েও কোটি কোটি গুণ বেশি দয়ালু। তিনি প্রজ্ঞা ও ন্যায়ের সাথে যা ইচ্ছা তাই করেন। আর আমরা কেবলই তাঁর গোলাম বা বান্দা। আমাদের নিজেদের সীমা জানা উচিত এবং তা অতিক্রম করা কক্ষণোই উচিত নয়।

কিন্তু আমরা আজ কী করছি?

​আমাদের বর্তমান আচরণ দেখলে মনে হয় আমরা নিজেদের গুনাহের কথা ভুলে গেছি।

  • অন্যের মৃত্যু নিয়ে তামাশা: আমরা অন্যের মৃত্যু বা করুণ পরিণতি নিয়ে হাসাহাসি ও তামাশা করি— যেন আমরা নিজেরা কখনো মারা যাব না, বা আমাদের মৃত্যু খুব চমৎকারভাবে হবে।
  • অন্যের পাপ অন্বেষণ: আমরা সারাদিন অন্যের খুঁত ও পাপ খুঁজে বেড়াই— যেন আমরা নিজেরা নিষ্পাপ ও ধোয়া তুলসী পাতা।
  • সহজেই দোজখে পাঠানো: আমরা অন্যকে এত সহজেই দোযখে পাঠিয়ে দিই— যেন আমরা নিজেরা জান্নাতের অগ্রিম টিকিট পেয়ে গেছি এবং আমাদের জান্নাতে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথই নেই!

উপসংহার ও আমাদের শিক্ষা

​ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর এই ঘটনা আমাদের শেখায় যে, একজন মুমিনের ভাষা হবে বিনম্র এবং অন্তর হবে আল্লাহর ভয়ে কম্পিত। অন্যের বিচার করার আগে নিজের আমলনামা সংশোধন করা জরুরি। আসুন, আমরা হুজুগে পড়ে কারো পরকাল নিয়ে ফয়সালা না দিই। যেকোনো পাপী মানুষের মৃত্যুর পর তার হিসাব আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিই এবং নিজেদের ঈমান ও শেষ পরিণতির জন্য আল্লাহর কাছে প্রতিনিয়ত কান্নাকাটি করি।

​আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই অহংকার থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন এবং দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন, সুম্মা আমীন।


0 Comments

Post a Comment

Post a Comment (0)

Previous Post Next Post