অসমাপ্ত এক প্রেমের কাহিনী
প্রথম অধ্যায়:_______________ কাদা-মাটির দিনগুলো
দ্বিতীয় অধ্যায়:_____________ নীল বিষাদে ঘেরা আকাশ
তৃতীয় অধ্যায়: _____________হৃদপিণ্ডে কুঠারাঘাত
চতুর্থ অধ্যায়: ______________পবিত্রতা ও প্রতীক্ষা
পঞ্চম অধ্যায়: ____________এক নিঃস্বার্থ প্রস্তাব
ষষ্ঠ অধ্যায়: ______________মেহেদী রাঙা বিষাদ
সপ্তম অধ্যায়: _____________জেদের আগুনে পুড়ে যাওয়া স্বপ্ন
অষ্টম অধ্যায়: _____________শারমিনের উদারতা ও একটি বিচ্ছেদ
নবম অধ্যায়: ______________স্মৃতির জানালায় দাঁড়িয়ে
প্রকাশকাল: ২০২৬, বাংলাদেশ, ঢাকা
অসমাপ্ত এক প্রেমের কাহিনী
প্রথম অধ্যায়: কাদা-মাটির দিনগুলো
কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর থানার অন্তর্গত শ্রীকাইল ইউনিয়নের একটি শান্ত গ্রাম—সাহেব নগর। যে গ্রামটিকে ঘিরে আছে সবুজের সমরোহ আর মেঠো পথের আলপনা। এই গ্রামের ধুলোমাখা পথেই শুরু হয়েছিল এক নামহীন সম্পর্কের প্রথম স্পন্দন। আমির হোসেনের ছেলে এম এস মনির খান আর আমির হোসেনের আপন ছোট ভাই আলেপ খাঁর মেয়ে সুমি। সম্পর্কের বিচারে তারা আপন চাচাতো ভাই-বোন হলেও, নিয়তি তাদের জন্য শৈশব থেকেই লিখে রেখেছিল এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন।
স্মৃতির পাতা উল্টালে দেখা যায় ৫ বছরের দুটি ছোট শিশু। যাদের একজন আরেকজনকে না দেখলে পাগল হয়ে যেত। গ্রামের ধুলোমাখা পথে মনির যেখানে যেত, সুমি তার পেছনে ছায়ার মতো লেগে থাকত। তাদের মধ্যে তখন কোনো সংকোচ ছিল না, ছিল না কোনো পর্দা। সেই বয়সের সারল্য এতটাই গভীর ছিল যে, তারা যখন ৯ বছর বয়সের কোঠায়, তখনও তাদের মধ্যে কোনো আড়াল তৈরি হয়নি। এমনকি তারা যখন প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে যেত, তখনও একজন আরেকজনকে ছেড়ে যেত না। একই জায়গায় বসে নির্দ্বিধায় প্রস্রাব-পায়খানা করত তারা—শৈশবের সেই নিবিড় ঘনিষ্ঠতায় কোনো লজ্জা বা দ্বিধা স্থান পায়নি। একে অপরের প্রতি এই যে অগাধ নির্ভরতা, এটাই ছিল তাদের বড় হওয়ার প্রথম ধাপ।
শৈশবের সেই দিনগুলোতে তাদের প্রিয় খেলা ছিল ‘জোলাপাতি’। মাটির হাঁড়ি-পাতিল আর লতা-পাতা দিয়ে সাজানো সেই সংসারে মনির সাজত স্বামী আর সুমি সাজত তার লক্ষ্মী ঘরনি। তাদের সাথে আরও ছিল মামুন, রিতা, শিপা আর রমজানের মতো খেলার সাথীরা। তারা সবাই মিলে যখন লুকোচুরি খেলত, তখন ভিড়ের মাঝেও মনির আর সুমির চোখ শুধু একে অপরকে খুঁজত। সুমি সবসময় চাইত মনিরই যেন তাকে খুঁজে বের করে, আর মনিরও যেন সুমিকে ছাড়া অন্য কাউকে খুঁজতে চাইত না।
এভাবেই কাটছিল সাহেব নগরের শান্ত দুপুরগুলো। সময় গড়িয়ে যখন তাদের বয়স ১১ বছর ছুঁইছুঁই, তখন তাদের সেই অবুঝ বন্ধুত্বে এক অন্যরকম দোলা লাগল। কৈশোরে পা দেওয়ার সাথে সাথেই মনের কোণে এক অজানা প্রেমের অঙ্কুরোদগম হলো। তারা বুঝতে পারল, এটা আর কেবল খেলাধুলা নেই। একে অপরকে না দেখলে বুকের ভেতর এক অসহ্য হাহাকার শুরু হয়, কথা না বললে দম বন্ধ হয়ে আসে। সেই ১১ বছর বয়সেই তারা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিল—দুনিয়া যেদিকেই যাক, তারা একে অপরকে ছাড়া বাঁচবে না। কিন্তু তারা জানত না, এই সাহেব নগর গ্রামের মেঠো পথেই তাদের জন্য অপেক্ষা করছে এক দীর্ঘ বিরহ আর ভাঙনের গল্প।
[প্রথম অধ্যায় সমাপ্ত]
অসমাপ্ত এক প্রেমের কাহিনী
দ্বিতীয় অধ্যায়: নীল বিষাদে ঘেরা আকাশ
সাহেব নগর গ্রামের আলো-বাতাসে মনির আর সুমি যখন বড় হতে লাগল, তখন তাদের সেই শৈশবের ‘স্বামী-স্ত্রী’ খেলা কখন যে বাস্তবে রূপ নিল, তারা নিজেরাও বুঝতে পারেনি। ১১ থেকে ১২ বছর বয়সটা ছিল এক অদ্ভুত মায়ার সময়। সেই সময় তাদের একজনের প্রতি অন্যজনের যে টান তৈরি হয়েছিল, তা আর কেবল চাচাতো ভাই-বোনের স্নেহে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাদের এই গভীর মোহাব্বতের কথা গ্রামের মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগল না।
কিন্তু গ্রামবাংলার রক্ষণশীল সমাজে এই প্রেমের পরিণতি সব সময় সুখকর হয় না। যখনই এই সম্পর্কের খবর দুই পরিবারের কানে পৌঁছাল, শুরু হলো অশান্তি। মনিরের মা এবং সুমির মা—কেউই এই সম্পর্ক মেনে নিতে পারলেন না। চাচাতো ভাই-বোনের এই প্রেমকে তারা পাপ হিসেবে গণ্য করতে লাগলেন। সুমির পরিবার থেকে তাকে শাসন করা শুরু হলো, আর মনিরকেও থাকতে হলো কড়া নজরে।
এরই মধ্যে একদিন বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো খবর এলো। সুমির বাবা আলিফ খাঁ সিদ্ধান্ত নিলেন, সুমিকে আর গ্রামে রাখা নিরাপদ নয়। তার জেদ আর অবাধ্যতা রুখতে তিনি তড়িঘড়ি করে অন্য এক ছেলের সাথে সুমির বিয়ে ঠিক করে ফেললেন। যেদিন বিয়ের কথা পাকাপাকি হলো, সেদিন মনির ছিল গ্রামের এক ফসলি জমিতে। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সে যখন হাড়ভাঙা খাটুনি দিচ্ছিল, তখন সুমির বোন শিপা দৌড়ে এলো মাঠের আইল ধরে। হাপাতে হাপাতে সে বলল, “মনির ভাই, সর্বনাশ হয়ে গেছে! সুমি আপার বিয়া ঠিক হয়ে গেছে!”
শিপার সেই একটি বাক্য মনিরের কানে যেন তপ্ত সিসার মতো লাগল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছে, আর বিশাল আসমানটা ভেঙে তার মাথার ওপর পড়ছে। চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে এলো। মনির পাগলের মতো দৌড়ে বাড়ি আসলো। বাড়ির ভেতর তখন বিয়ের সাজসাজ রব।
মনির আড়ালে গিয়ে দেখল, সুমি একটি ঘরে একা শুয়ে আছে। হয়তো কেঁদে কেঁদে ক্লান্ত হয়ে সে ঘুমিয়ে পড়েছে, অথবা নির্জীব হয়ে পড়ে আছে। মনির দরজার আড়াল থেকে এক দৃষ্টিতে সুমির দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, কে যেন ধারালো ছুরি দিয়ে তার কলিজাটা এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিচ্ছে। বুকের ভেতর এক অব্যক্ত হাহাকার জমে উঠল, কিন্তু চিৎকার করে কাঁদার উপায় নেই। সেই দিন থেকে মনির এক জীবন্ত পাথরে পরিণত হলো। তার হাসিখুশি মুখটা যেন এক নিমিষেই বিষাদে কালো হয়ে গেল।
সবচেয়ে বেশি কষ্ট হলো যখন মনির দেখল, বিয়ের তারিখ ঠিক হওয়ার পর থেকে সুমি আর তার সাথে কোনো কথা বলছে না। সুমির এই নীরবতা মনিরের বুকে তীরের মতো বিঁধছিল। সে বুঝতে পারছিল না, সুমি কি ভয়ে কথা বলছে না নাকি অভিমানে? বিয়ের আগের দিনগুলো মনিরের কাছে নরক যন্ত্রণার মতো মনে হতে লাগল। বাড়ির সবাই যখন উৎসবে ব্যস্ত, মনির তখন এক কোণে বসে একা একা চোখের জল ফেলছিল। যে মানুষটির সাথে সারা জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখেছিল, আজ তাকেই অন্য কারো হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তুতি দেখতে হচ্ছে—এই কষ্টের চেয়ে বড় কোনো যন্তণা পৃথিবীতে আর কী হতে পারে!
[দ্বিতীয় অধ্যায় সমাপ্ত]
অসমাপ্ত এক প্রেমের কাহিনী
তৃতীয় অধ্যায়: হৃদপিণ্ডে কুঠারাঘাত
বিয়ের দিন ঘনিয়ে এল। সাহেব নগর গ্রামে আজ উৎসবের ধুম। চারিদিকে সানাইয়ের সুর আর মানুষের কোলাহল, কিন্তু মনিরের কাছে এই সুর যেন ছিল এক একটি বিলাপের মতো। মনিরের ঘর আর সুমির ঘর একদম পাশাপাশি, তাই প্রতিবেশীদের আনন্দ আর হাসাহাসি তার বুকের ভেতর তীরের মতো বিঁধছিল। সবাই যখন বিয়ের আয়োজনে ব্যস্ত, মনির তখন এক জীবন্ত পাথরে পরিণত হয়েছে। তার পেটে দানাপানি নেই, চোখে ঘুম নেই, মুখে কোনো কথা নেই।
এরই মধ্যে বরযাত্রী আসার সময় হলো। হঠাৎ সুমির বাবা আলিফ খাঁ মনিরকে ডেকে বললেন, “ভাতিজা, বরযাত্রী তো চলে আসছে, তুমি গিয়ে গেটে দাঁড়াও। সবাইকে রিসিভ করে ভেতরে নিয়ে আসো।”
চাচুর সেই কথাটা মনিরের কানে বিষের মতো লাগল। যে মানুষটিকে সে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসে, তাকে যে লোকটা কেড়ে নিতে এসেছে, তাকেই বরণ করে নিতে হবে? মনির প্রথমে রাজি হতে চায়নি, কিন্তু বড়দের সম্মান আর পারিবারিক সম্পর্কের খাতিরে সে না করতে পারল না। এক বুক হাহাকার আর পাথর চাপা কষ্ট নিয়ে সে গেটে গিয়ে দাঁড়াল। হাসিমুখে বরযাত্রীদের বরণ করার অভিনয় করতে করতে তার ভেতরটা যেন পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছিল। বরযাত্রী ভেতরে ঢোকার পর মনির আর সেখানে স্থির থাকতে পারল না। সে গ্রামের সেই নির্জন নদীর পাড়ে গিয়ে একা বসে রইল। জনশূন্য নদীর পাড়ে বসে সে অঝোরে কাঁদতে লাগল, যেন তার চোখের জলেই নদীর জল বেড়ে যাবে।
ওদিকে সুমির বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেল। কাজি সাহেবের 'কবুল' শব্দটা হয়তো মনিরের কানে পৌঁছায়নি, কিন্তু তার হৃদয়ে সেই কম্পন ঠিকই অনুভূত হচ্ছিল। একটু পরেই বিদায়ের ঘণ্টা বাজল। সুমির স্বামী সুমিকে নিয়ে রওনা দিল। নদীর পাড় থেকে মনির দেখতে পেল সেই দৃশ্যটা—যাকে পাওয়ার জন্য সে শৈশব থেকে স্বপ্ন বুনেছে, সে আজ লাল বেনারসি পরে অন্য কারো গাড়িতে করে চলে যাচ্ছে। মনিরের মনে হলো তার পুরো পৃথিবীটা বুঝি চুরমার হয়ে মাটির সাথে মিশে গেছে। তার বুক ফেটে কান্না আসছিল, কিন্তু কাঁদার শক্তিও যেন সে হারিয়ে ফেলেছে।
রাত নেমে এল। মনিরের মা নদীর পাড় থেকে তার ছেলেকে হাত ধরে টেনে বাড়িতে নিয়ে আসলেন। মা অনেক চেষ্টা করলেন তাকে কিছু খাওয়ানোর জন্য, কিন্তু মনিরের গলা দিয়ে এক ঢোক জলও নামল না। সারা রাত সে একটুও ঘুমাতে পারল না। চোখের সামনে বারবার সুমির সেই মুখটা ভেসে উঠছিল। যে উঠোনে তারা এক সাথে খেলেছে, যে পথে এক সাথে হেঁটেছে, আজ সেই পথে সুমি পরপুরুষের সাথে চিরদিনের জন্য চলে গেল। মনিরের কাছে সেই রাতটি ছিল জীবনের দীর্ঘতম এবং সবচেয়ে যন্ত্রণাময় এক রাত। সে কেবল ভাবছিল, বিধাতা কেন তাদের এমন এক কঠিন পরীক্ষায় ফেললেন?
[তৃতীয় অধ্যায় সমাপ্ত]
অসমাপ্ত এক প্রেমের কাহিনী
চতুর্থ অধ্যায়: পবিত্রতা ও প্রতীক্ষা
বিয়ের পরের দিনটি ছিল সাহেব নগর গ্রামের জন্য এক নতুন উত্তেজনার সকাল, কিন্তু মনিরের কাছে তা ছিল বিষাদসিন্ধু। গতরাতের সেই কান্না আর বিনিদ্র যন্ত্রণার রেশ কাটেনি তখনও। ঠিক সেই মুহূর্তে সুমির শ্বশুরবাড়ি থেকে একটি খবর এলো, যা মুহূর্তের মধ্যে পুরো গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল।
সুমির স্বামী কল করে সুমির বাবাকে জানালো এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। সে অভিযোগ করল, “আপনার মেয়ে আমাকে সহ্যই করতে পারছে না। সে আমার কাছে তো আসেই না, এমনকি কাল রাতে আমাকে বাসর ঘরে প্রবেশ করতেও দেয়নি। সে যেন এক জ্যান্ত প্রতিমূর্তি হয়ে বসে আছে।”
এই খবর যখন মনিরের কানে পৌঁছালো, তার বিষণ্ণ মনে এক চিলতে প্রশান্তির ছোঁয়া লাগল। এক অদ্ভুত ভালো লাগা তাকে ঘিরে ধরল—কারণ সে বুঝতে পারল, সুমি কেবল শরীরে অন্য ঘরে গেছে, কিন্তু তার আত্মা আর পবিত্রতা আজও কেবল মনিরের জন্যই তোলা আছে। অন্য কোনো পুরুষ তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। সুমির এই অবাধ্যতা আর জেদ আসলে মনিরের প্রতি তার ভালোবাসার এক বিশাল মৌন প্রতিবাদ।
এরই মধ্যে প্রথা অনুযায়ী সুমিকে তার বাবার বাড়িতে ফিরিয়ে আনার (নাইওর) সময় হলো। সুমির বাবা আলিফ খাঁ মনিরকে ডেকে বললেন, “ভাতিজা, সুমিকে আনতে তো যেতে হবে। তুমিও আমাদের সাথে চলো।”
মনির প্রথমে শক্তভাবে না করে দিল। যে দৃশ্য তাকে তিলে তিলে মারছে, সেখানে সে পুনরায় নিজেকে ফেলতে চায়নি। কিন্তু চাচুর অনুরোধ আর পরিবারের সবার চাপে সে বাধ্য হলো। এক বুক দুরুদুরু কাঁপন নিয়ে মনির যখন সুমির শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছালো, তখন এক অন্যরকম দৃশ্য তৈরি হলো। সুমি যখনই মনিরকে দেখল, তার মলিন মুখে এক মুহূর্তের জন্য যেন হাজার সূর্যের আলো ফুটে উঠল। ঠিক তেমনি মনিরও সুমিকে দেখে এক দীর্ঘস্থায়ী প্রশান্তি পেল। তাদের সেই চাউনি আর চোখের ভাষায় হাজারো না বলা কথা আদান-প্রদান হয়ে গেল।
সুমি তার স্বামীকে নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে আসলো বটে, কিন্তু তার সিদ্ধান্ত ছিল অটল। সে পরিষ্কার জানিয়ে দিল, “আমি এই স্বামীর সংসার করব না।” বাড়ির বড়রা অনেক বোঝানোর চেষ্টা করল, শাসনের ভয় দেখালো, কিন্তু সুমি ছিল হিমালয়ের মতো অনড়। তার মনে মনে একটাই নাম জপছিল—মনির। এভাবে দুই মাস কাটল। সুমি আর স্বামীর ঘরে ফিরল না। অবশেষে সেই অমিল আর মানসিক দূরত্বের কারণে তাদের বিচ্ছেদ বা ডিভোর্স হয়ে গেল।
ডিভোর্সের পর সুমি ভেঙে পড়ল না। সে চাইল না তার এই ব্যর্থ জীবনের বোঝা তার বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওপর পড়ুক। এক বুক আত্মসম্মান আর জেদ নিয়ে সে পাড়ি জমালো রাজধানী ঢাকা শহরে। উদ্দেশ্য—নিজের পায়ে দাঁড়ানো। নিজের পরিচয় নিজে গড়া। আর অন্যদিকে মনিরও ভাগ্যের সন্ধানে পাড়ি জমালো প্রবাসের মাটিতে। দুই জন দুই প্রান্তে চলে গেল, মাঝখানে পড়ে রইল সাহেব নগরের সেই অসমাপ্ত স্মৃতির ধুলোবালি। দীর্ঘ তিন বছর তাদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ ছিল না, ছিল না কোনো খবরাখবর। কিন্তু নিয়তি যার নাম লিখে রেখেছে হৃদয়ে, তাকে ভুলে থাকা কি এতই সহজ?
[চতুর্থ অধ্যায় সমাপ্ত]
অসমাপ্ত এক প্রেমের কাহিনী
পঞ্চম অধ্যায়: হৃদয়ের টান ও এক নিঃস্বার্থ প্রস্তাব
ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাসে মনির আর সুমি এখন দুই মেরুর বাসিন্দা। মনির প্রবাসের তপ্ত মরুভূমিতে নিজের ঘাম ঝরাচ্ছে, আর সুমি ঢাকা শহরের যান্ত্রিক ভিড়ে নিজেকে টিকিয়ে রাখার লড়াই করছে। দেখতে দেখতে দীর্ঘ তিনটি বছর কেটে গেল। এই তিন বছরে তাদের মধ্যে কোনো কথা হয়নি, কোনো চিঠির আদান-প্রদান হয়নি। কিন্তু প্রবাসের নির্জন রাতে মনির যখন আকাশের দিকে তাকাত, তখন সাহেব নগর গ্রামের সেই মেঠো পথ আর সুমির কান্নারত মুখটা তার চোখের সামনে ভেসে উঠত। ঠিক একইভাবে সুমিও হয়তো কোনো এক জানালার গ্রিল ধরে মনিরের কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলত।
মানুষ বলে, যার সাথে মনের টান থাকে, বিধাতা তাকে কোনো না কোনোভাবে মিলিয়ে দেন। হঠাৎ করেই একদিন মিরাকলের মতো মনির সুমির কন্টাক্ট নম্বরটা জোগাড় করে ফেলল। সেই প্রথম ফোন কলটা যখন মনির করল, ফোনের ওপাশে দীর্ঘ নীরবতার পর শোনা গেল সুমির কান্নার শব্দ। তিনটি বছরের জমে থাকা সব অভিমান আর দীর্ঘশ্বাস যেন সেই কান্নার স্রোতে ভেসে গেল। আবার শুরু হলো তাদের সেই কথা বলা, ভাবের আদান-প্রদান। তাদের প্রেম যেন মরুর বুকে বৃষ্টির মতো আবার সজীব হয়ে উঠল।
সুমি তার জীবনের সব যন্ত্রণার কথা মনিরকে খুলে বলল। সে আজও মনিরকে আগের মতোই ভালোবাসে, হয়তো আগের চেয়েও বেশি। কিন্তু সুমির মনে এক গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছিল। সে মনিরকে উদ্দেশ্য করে বলল, "আমি তো এখন কলঙ্কিত, আমার একবার বিয়ে হয়ে গেছে। আমি চাইলেও সমাজ আর আমাদের পরিবার হয়তো আমাদের একসাথে থাকতে দেবে না। কিন্তু মনির, আমি আপনাকে ছাড়া অন্য কাউকে স্বামী হিসেবে ভাবতে পারি না।"
এরই মধ্যে সুমি মনিরকে এমন একটি প্রস্তাব দিল যা শুনে মনিরের বুকটা হু হু করে উঠল। সুমি বলেছিল, "আমি আপনাকে জোর করব না যে আপনি আমাকে সবার সামনে স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দিন। আমি শুধু চাই আপনি আমার স্বামী হোন। আমাকে আলাদা একটি বাসায় রাখবেন, আমাকে একটি সন্তান (বেবি) দেবেন। আমি সেই সন্তানকে আপনার স্মৃতি হিসেবে আগলে রেখে আমার বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেব। আপনি চাইলে আপনার বাবা-মার পছন্দের অন্য কোনো মেয়েকে বিয়ে করে সংসার করবেন, তাতে আমার কোনো আপত্তি থাকবে না। আমি কেবল আপনার একটুখানি ভাগ চেয়ে বেঁচে থাকতে চাই।"
সুমির এই নিঃস্বার্থ আর আত্মত্যাগী প্রস্তাব শুনে মনিরের চোখ ভিজে উঠল। যে মেয়েটি তাকে এতটা ভালোবাসতে পারে, তার জন্য মনিরও সব করতে রাজি হলো। এভাবে কেটে গেল আরও দুটি বছর। সুমি কেবল মনিরের জন্য পথ চেয়ে অপেক্ষায় থাকল।
দীর্ঘ কয়েক বছর পর মনির যখন দেশে ফিরল, তখন সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হলো। সুমিকে প্রথম দেখার মুহূর্তটা ছিল অপার্থিব। অনেক বছর পর যখন দুই জোড়া চোখ এক হলো, তখন মনে হলো সময় যেন থমকে গেছে। মনির সুমিকে দেখে তার নয়ন জুড়িয়ে ফেলল। সেই আগের সুমি আর এই সুমির মধ্যে অনেক পার্থক্য, চেহারায় কষ্টের ছাপ থাকলেও ভালোবাসার জ্যোতিটা আগের মতোই অটুট।
পরের দিনই মনির সুমিকে বলল, "তোমার সাথে আমার অনেক কথা জমে আছে। আমি তোমার সাথে একান্তে কিছু কথা বলতে চাই।" সুমি সানন্দে রাজি হলো। এক নিঝুম রাতে, সবার অগোচরে মনির আর সুমি দেখা করল। সেই রাতে আকাশের চাঁদ সাক্ষী ছিল তাদের না বলা কথাগুলোর। তারা একে অপরের হাত ধরে কতক্ষণ বসে ছিল তার হিসেব নেই। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সব দুঃখ বুঝি সেই মুহূর্তের আনন্দের কাছে হার মেনে গেছে। তারা দুজনেই তখন এক নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছিল। কিন্তু তারা কি জানত, নিয়তি তাদের জন্য আবারও এক অন্ধকার অধ্যায় লিখে রেখেছে?
সুমির সেই প্রস্তাবটি মনিরের হৃদয়ে এক বিশাল পাহাড়ের মতো চেপে বসল। সে ভাবল, যে ভালোবাসা সামাজিক স্বীকৃতির চেয়েও বড় হতে চায়, তার মূল্য কত বিশাল। মনির জানত না এই সম্পর্কের শেষ কোথায়, কিন্তু সে এটুকু বুঝতে পারছিল—তাদের এই প্রেমের কাহিনী হয়তো কোনোদিন পূর্ণতা পাবে না, তবে এর গভীরতা হবে আকাশছোঁয়া।
[পঞ্চম অধ্যায় সমাপ্ত]
অসমাপ্ত এক প্রেমের কাহিনী
ষষ্ঠ অধ্যায়: মেহেদী রাঙা বিষাদ
মনির আর সুমি যখন নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছিল, ঠিক তখনই ভাগ্যের চাকা উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করল। প্রবাস থেকে ফেরার পর মনিরের পরিবারে তাকে নিয়ে নতুন পরিকল্পনা শুরু হয়। একদিন হঠাৎ করেই মনিরের মামা ইউনুস তার সামনে এক প্রস্তাব নিয়ে হাজির হলেন। তিনি অত্যন্ত গম্ভীর স্বরে বললেন, “ভাগ্নে, আমি তোর জন্য একটা সম্বন্ধ ঠিক করেছি। আমার ভাজতি, অর্থাৎ তোর মামাতো বোন শারমিনকে তুই বিয়ে করবি। মেয়েটা অনেক ভালো, আমাদের ঘরের মেয়ে।”
কথাটা শুনে মনিরের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। সে তো মনে মনে সুমিকে কথা দিয়ে রেখেছে। কিন্তু গ্রাম বাংলার পারিবারিক কাঠামোয় বড়দের কথার অবাধ্য হওয়া কতটা কঠিন, তা মনির মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছিল। মামা ইউনুস যখন শারমিনের বাবা আবু সাইয়েদ এর কাছে প্রস্তাবটি পাঠালেন, তিনিও সানন্দে রাজি হয়ে গেলেন। মনির এক উভয় সংকটে পড়ে গেল। একদিকে তার শৈশবের প্রেম সুমি, অন্যদিকে তার পরম শ্রদ্ধেয় বড়রা আর পরিবারের সম্মান। মনির মুখ ফুটে বলতে পারল না যে সে সুমিকে চায়। তার বুক ফেটে যাচ্ছিল, কিন্তু মুখ দিয়ে শব্দ বের হচ্ছিল না। এক প্রকার পরিস্থিতির শিকার হয়ে এবং পরিবারের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে সে এই বিয়েতে রাজি হতে বাধ্য হলো তারপরে মনির চিন্তা করলো সে শারমিনের সাথে পারসনালি কথা বলবে তাই করলো মনির মামার বাড়িতে গিয়ে শারমিনের সাথে পারসনালি কথা বলার ইচ্ছে প্রকাশ করলো শারমিন রাজি হলো মনির শারমিন কে জিজ্ঞেস করলেন শারমিন তুমি কি জানো আমি আমার চাচাতো বোন সুমি কে ভালোবাসি শারমিন উত্তরে বল্লো হে জানি তারপর মনির বল্লো তুমি জেনেও আমাকে বিয়ে করতে রাজি কেনো হলে তখন শারমিন বল্লো আপনি একজন ভালো মানুষ তাই তবে আপনি যুদি আমাকে পছন্দ না হয় তাহলে আপনি আমাকে বলতে পারেন আমি আমার ফ্যামিলিকে বলবো বিয়েটা ভেংগে দেওয়ার জন্য তখন মনির বল্লো না দরকার নাই কারন তুমিও অনেক ভালো মনের মানুষ তুমার কোনো দোষ নাই তবে তুমার সাথে বিয়ে হয়ার পরে আমি যুদি সুমির সাথে কথা বলি তুমি কি কিছু মনে করবে তখন শারমিন বল্লো না আমি আপনার ভালোবাসাকে সম্মান করি তবে তার জন্য আমাকে কষ্ট দিয়েন না তখন মনির বল্লো না তুমাকে কষ্ট দিবো না ।
এই খবর যখন সুমির কানে পৌঁছাল, তার অবস্থা হলো সেই বনস্পতির মতো যার শেকড় এক নিমিষেই উপড়ে ফেলা হয়েছে। সুমির সাজানো বাগানটা আবারও তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। তার সেই দীর্ঘ কয়েক বছরের অপেক্ষা, সেই আত্মত্যাগ—সবই যেন এক মুহূর্তেই মূল্যহীন হয়ে গেল। কিন্তু সুমি ছিল এক অদ্ভুত ধৈর্যশীলা মেয়ে। সে নিজের কষ্টকে আড়াল করে কেবল নীরবে চোখের জল ফেলতে লাগল।
দেখতে দেখতে মনিরের গায়ে হলুদের দিন চলে এলো। পুরো সাহেব নগর গ্রামে তখন খুশির আমেজ, শুধু দুটি মানুষের অন্তরে জ্বলছিল চিতার আগুন। সুমি সেই দিন বাড়িতেই ছিল। তার কান্না কোনো বাঁধ মানছিল না। সে জানত, আজকের পর মনির চিরদিনের জন্য অন্য কারো হয়ে যাবে। মনির সেই রাতে সুমির কান্নার শব্দ যেন নিজের হৃদপিণ্ডে অনুভব করতে পারছিল। কিন্তু সামাজিক দায়বদ্ধতা তাকে এক লোহার শিকলে বেঁধে ফেলেছে।
সেই হলুদের সন্ধ্যায় এক অদ্ভুত জেদ চাপল মনিরের মাথায়। সে চাইল তার জীবনের শেষ পবিত্র স্মৃতিটুকু যেন সুমির হাত দিয়েই আসে। মনির সুমিকে ডেকে বলল, “সুমি, আমি চাই তুমি আমার হাতে মেহেদী পরিয়ে দাও।” সুমি প্রথমে দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করল। যে হাত দিয়ে সে মনিরকে নিজের করে পাওয়ার স্বপ্ন দেখেছে, সেই হাত দিয়ে অন্য কারো সাথে বিয়ের মেহেদী সে কীভাবে পরাবে? কিন্তু মনির ছিল নাছোড়বান্দা। সে সুমির হাত ধরে এক প্রকার টেনে নিয়ে বসাল এবং করুণ স্বরে বলল, “আমার এই শেষ ইচ্ছেটুকু পূর্ণ করো।”
অগত্যা সুমি বাধ্য হলো। কাঁপাকাপাঁ হাতে সে মনিরের তালুতে মেহেদীর আলপনা আঁকতে লাগল। মেহেদীর প্রতিটি ফোঁটার সাথে সুমির চোখের জল মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। সেই দৃশ্যটা ছিল কলিজা ছিঁড়ে ফেলার মতো। সুমি যখন মনিরের হাতে মেহেদী দিচ্ছিল, তখন তাদের দুজনেরই কোনো কথা ছিল না, কেবল ছিল চোখের জল আর দীর্ঘশ্বাস। সেই রাতটা সুমি এক মুহূর্তের জন্যও চোখ বুঁজতে পারেনি। সারা রাত তার ঘর থেকে কেবল ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ ভেসে আসছিল।
পরদিন সকালে সূর্য উঠলে এক নতুন বাস্তবতার জন্ম হলো। সুমি সিদ্ধান্ত নিল, সে আর এই গ্রামে থাকবে না। সে দেখতে পারবে না মনিরকে অন্য কারো সাথে ঘর করতে। সে আবারও তল্পিতল্পা গুছিয়ে শহরের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। যাওয়ার সময় মনির তাকে অনেকবার আটকানোর চেষ্টা করেছিল, ফিরে আসার অনুরোধ করেছিল, কিন্তু সুমি এবার আর ফিরে তাকালো না। সে কেবল একরাশ দীর্ঘশ্বাস আর একটি ভাঙা মন নিয়ে সাহেব নগর গ্রামের মেঠো পথ পেছনে ফেলে চলে গেল। মনির চেয়ে চেয়ে দেখল তার জীবনের একমাত্র ধ্রুবতারাটি দিগন্তের ওপারে হারিয়ে যাচ্ছে।
[ষষ্ঠ অধ্যায় সমাপ্ত]
অসমাপ্ত এক প্রেমের কাহিনী
সপ্তম অধ্যায়: জেদের আগুনে পুড়ে যাওয়া স্বপ্ন
সুমি শহর চলে যাওয়ার পর মনিরের জীবনটা যেন মরুভূমির মতো হয়ে গেল। একদিকে নতুন বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা, অন্যদিকে বুকের ভেতর সুমিকে হারানোর তীব্র জ্বালা। পুরুষ মানুষের কান্না কেউ দেখতে পায় না, কিন্তু মনিরের ভেতরটা তখন আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলছিল। এই মানসিক অস্থিরতা থেকে মনির একদিন সুমিকে ফোন করল। ফোনে তাদের মধ্যে প্রচণ্ড কথা কাটাকাটি হলো। অভিমানে আর রাগের মাথায় মনির সুমিকে অত্যন্ত নিষ্ঠুর কিছু কথা বলে বসল। মনির বলেছিল, “তোমাকে কোনোদিন কোনো ছেলে পছন্দ করবে না, তুমি এই একলাই থেকে যাবে।”
আসলে মনির এই কথাগুলো বলেছিল সুমির প্রতি গভীর ভালোবাসা আর অধিকারবোধ থেকে। সে চেয়েছিল সুমি যেন রেগে গিয়ে হলেও তার ওপর একটা দাবি রাখে, কিংবা জিদ করে হলেও নিজের একটা গতি করে নেয়। কিন্তু সুমি এই কথাগুলোকে সরাসরি হৃদয়ে বিঁধিয়ে নিল। তার মনে হলো, যে মানুষের জন্য সে নিজের জীবনটা উৎসর্গ করতে চেয়েছিল, সেই আজ তাকে এমন অপবাদ দিচ্ছে? সুমি এক ভয়াবহ জেদ চেপে বসল নিজের মনে। সে ঠিক করল, সে প্রমাণ করে দেবে যে তাকেও কেউ ভালোবাসতে পারে।
সেই মূহুর্তেই সুমি লিটন নামের এক প্রবাসীকে ফোন করল। লিটন সিঙ্গাপুরে থাকে এবং সে আগে থেকেই সুমিকে মনে মনে অনেক পছন্দ করত। সুমি ফোনের ওপাশ থেকে কাঁদতে কাঁদতে লিটনকে বলল, “আপনি কি আমাকে বিয়ে করবেন? যদি করেন, তবে আজকের মধ্যেই করতে হবে।”
লিটন থতমত খেয়ে গেল। সে জানত সুমি আর মনিরের সেই অমর প্রেমের কাহিনী। সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেন সুমি? তুমি না মনিরকে ভালোবাসতে? হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত কেন?” সুমি কেবল এক কথাই বলল, “আপনি আমাকে বিয়ে করবেন কি না বলেন? করলে আজই করতে হবে।” লিটন আগে থেকেই সুমিকে ভালোবাসত, তাই সে এই সুযোগ আর হাতছাড়া করতে চাইল না। সে রাজি হয়ে গেল। সেই দিনই মুঠোফোনের ওপাশে কাজি বসিয়ে সুমি আর লিটনের বিয়ে হয়ে গেল।
যখন এই খবর মনিরের কানে পৌঁছাল, তার পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। সে কল্পনাও করতে পারেনি তার বলা কথার পিঠে সুমি এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নেবে। মনিরের বুকটা হু হু করে কেঁদে উঠল—কারণ সে জানত, সুমি কেবল জেদের বশে এই কাজ করেছে। এখন অন্য একজন পুরুষ সুমির হাতে হাত রাখবে, তার ওপর অধিকার ফলাবে—এই চিন্তাটা মনিরকে কুরে কুরে খেতে লাগল। কিন্তু পরক্ষণেই মনির নিজেকে সান্ত্বনা দিল এই ভেবে যে, অন্তত সুমি একটা আশ্রয় তো পেয়েছে। সে ঘর-সংসার করে সুখে থাকবে, এটাই হয়তো বিধাতার লিখন ছিল।
এভাবেই দুটি জীবন দুটি আলাদা সমান্তরাল পথে চলতে শুরু করল। মনিরের জীবনে এলো স্ত্রী শারমিন, আর সুমির জীবনে এলো লিটন। সাহেব নগরের সেই দুই চাচাতো ভাই-বোনের অমর প্রেম যেন এক দীর্ঘশ্বাসের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেল। সময়ের স্রোতে তারা একে অপরের থেকে দূরে সরে গেলেও, হৃদয়ের কোথাও না কোথাও সেই পুরনো ক্ষতটা ঠিকই রয়ে গিয়েছিল। তারা দুজনেই সংসারী হলো, কিন্তু তাদের সেই পুরনো প্রেমটা রয়ে গেল এক ‘অসমাপ্ত কাহিনী’ হয়ে।
[সপ্তম অধ্যায় সমাপ্ত]
অসমাপ্ত এক প্রেমের কাহিনী
অষ্টম অধ্যায়: দশ বছরের ব্যবধান ও একটি শোকাতুর বিচ্ছেদ
সময় কারোর জন্য থেমে থাকে না। সাহেব নগরের মেঠো পথ দিয়ে বয়ে গেছে অনেক ঋতু। দেখতে দেখতে মনির আর সুমির জীবনের ক্যালেন্ডার থেকে দশটি বছর ঝরে গেল। এই দশ বছরে তাদের জীবন আমূল বদলে গেছে। মনির এখন দুই সন্তানের জনক—তার ঘর আলো করে এসেছে মেয়ে খাদিজা আর ছেলে ওসমান। অন্যদিকে সুমির সংসারেও এসেছে তিনটি নতুন প্রাণ—ইরফাত, বাইজিদ এবং সবার ছোট লামহা।
মনির তার নিজের সংসার সামলালেও, সুমির প্রতি তার সেই টান কখনো মুছে যায়নি। অদ্ভুত এক মায়ার বন্ধন ছিল সুমির মেজো ছেলে বাইজিদের সাথে। তিন বছর বয়সী বাইজিদকে যখনই মনির দেখত, তার মনে হতো এ যেন সুমির ভালোবাসারই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। মনির মনে মনে ভাবত, এই ছেলেটিকে সে নিজের কাছে নিয়ে আসবে, নিজের সন্তানের মতো করে বড় করবে। বাইজিদের চঞ্চলতা আর নিষ্পাপ হাসি মনিরের বিষণ্ণ মনে আনন্দের জোয়ার নিয়ে আসত।
কিন্তু নিয়তি বড় নিষ্ঠুর। বিধাতা যা দেন, তা কেড়ে নিতেও দ্বিধা করেন না। একদিন হঠাৎ করেই সাহেব নগর গ্রামে এক শোকের ছায়া নেমে এল। খবর পাওয়া গেল, সুমির কলিজার টুকরো, ছোট্ট বাইজিদ বাড়ির পাশের পুকুরের পানিতে ডুবে মারা গেছে। খবরটি যখন মনিরের কানে পৌঁছাল, তার মনে হলো কলিজাটা কেউ টেনে ছিঁড়ে ফেলেছে। যে ছেলেটিকে সে নিজের করে পেতে চেয়েছিল, সে আজ চিরদিনের জন্য না ফেরার দেশে চলে গেল।
সুমি তখন পাগলের মতো হয়ে গেছে। নিজের সন্তানের নিথর দেহ দেখে তার বুকফাটা আর্তনাদে সাহেব নগরের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠল। মনির দূর থেকে দাঁড়িয়ে সুমির সেই হাহাকার দেখছিল আর নিজের চোখের জল মুছছিল। বাইজিদের সেই ছোট্ট মুখটা বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। মনের গভীর থেকে কেবল একটি দোয়াই আসছিল— "হে আল্লাহ, এই নিষ্পাপ শিশুটিকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করো।" বাইজিদের মৃত্যু যেন মনির আর সুমির সেই পুরনো ক্ষতে নতুন করে নুন ছিটিয়ে দিল। এক অপূরণীয় শূন্যতা গ্রাস করল তাদের দুই পরিবারকে।
[অষ্টম অধ্যায় সমাপ্ত]
অসমাপ্ত এক প্রেমের কাহিনী
নবম অধ্যায়: স্মৃতির জানালায় দাঁড়িয়ে (উপসংহার)
বাইজিদের চলে যাওয়াটা যেন জীবনের এক কঠিন সত্যকে আমাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল। শোকাতুর সময়গুলো পার হয়ে আবার যখন পৃথিবী স্বাভাবিক হতে শুরু করল, মনির আর সুমি লক্ষ্য করল—জীবনের অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তারা এখন এক শান্ত মোহনায় এসে দাঁড়িয়েছে। যৌবনের সেই উত্তাল প্রেম, বিরহের হাহাকার আর বিচ্ছেদের জেদ এখন পরিণত হয়েছে এক গভীর শ্রদ্ধাবোধে।
বর্তমানে মনির তার স্ত্রী শারমিন এবং দুই সন্তান খাদিজা ও ওসমানকে নিয়ে এক গোছানো সংসার করছে। অন্যদিকে সুমিও তার স্বামী আর বাকি দুই সন্তানকে নিয়ে নিজের ঘর সামলাচ্ছে। দীর্ঘ বছরগুলোর ধুলোবালি তাদের দুজনের শরীর থেকে যৌবনের সেই চঞ্চলতা কেড়ে নিলেও, হৃদয়ের এক কোণে সেই পুরনো সাহেব নগরের মনির আর সুমি আজও বেঁচে আছে।
এখন মাঝে মাঝে তাদের মধ্যে কথা হয়। সেই কথাগুলোতে এখন আর কোনো দাবি নেই, নেই কোনো পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। বরং আছে একে অপরের প্রতি একরাশ শুভকামনা। তারা যখন পুরনো দিনের সেই ৫ বছর বয়সের স্মৃতি, একসাথে খেলাধুলা করা কিংবা সেই কিশোরী বয়সের অজান প্রেমে পড়ার গল্পগুলো আলোচনা করে, তখন তাদের মনের সব কষ্ট যেন নিমেষেই উধাও হয়ে যায়। তাদের এই যোগাযোগ এখন আর সমাজের চোখে কোনো অপরাধ নয়, বরং এটি হলো দুটি আত্মার এক গোপন প্রশান্তি।
অসমাপ্ত রয়ে গেছে তাদের প্রেমের কাহিনী, কিন্তু পূর্ণতা পেয়েছে তাদের সম্মান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা। মনির আজ বুঝতে পারে, সুমিকে সে তার পুরো জীবনে কখনো ভুলতে পারবে না। সুমিও জানে, মনিরের জন্য তার হৃদয়ে যে জায়গাটি আছে, সেখানে অন্য কেউ কোনোদিন পৌঁছাতে পারবে না। তাদের এই প্রেম হয়তো এই দুনিয়ার সাধারণ সংজ্ঞায় কোনো নাম পায়নি, কিন্তু পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলার কাছে তারা কেবল এটুকুই প্রার্থনা করে—যদি ইহকালে সম্ভব না হয়, তবে পরকালের কোনো এক শান্ত নিকেতনে যেন তাদের এই ভালোবাসা পূর্ণতা পায়।
আজ এই বইয়ের পাতা যখন পাঠক শেষ করবেন, তখন তাদের হৃদয়ে একটি হাহাকার হয়তো রয়ে যাবে। কিন্তু সেই সাথে জেগে থাকবে এক পরম শিক্ষা—ভালোবাসা মানে শুধু পাওয়া নয়, ভালোবাসা মানে ত্যাগের মাঝেও একে অপরের মঙ্গল কামনা করা। সাহেব নগরের সেই মনির আর সুমি আজও তাদের নিজ নিজ সংসারে সুখে আছে, আর মনের গহীনে সযত্নে লালন করে চলেছে সেই ‘অসমাপ্ত এক প্রেমের কাহিনী’।
[বইটির সমাপ্তি]
শেষ কথা:
সম্মানিত পাঠক, আপনি যে কাহিনীটি পাঠ করলেন, এর প্রতিটি শব্দ বাস্তব এবং সত্য। লেখক এম এস মনির খান তার নিজের জীবনের এই অমূল্য স্মৃতিগুলো আপনাদের সাথে ভাগ করে নিয়েছেন। আপনারা সবাই মনির এবং সুমি—দুজনের পরিবারের জন্যই দোয়া করবেন। আল্লাহ যেন তাদের দুনিয়া ও আখেরাতে শান্তিতে রাখেন এবং তাদের এই পবিত্র ভালোবাসা যেন পরকালে এক সুন্দর পরিণতির দিকে নিয়ে যান। ধন্যবাদ।
লেখক এম এস মনির খান



Post a Comment