অসমাপ্ত এক প্রেমের কাহিনী | চাচাতো ভাই এবং চাচাতো বোন | মনির আর সুমির প্রেমের গল্প

পাঠকদের উদ্দেশ্যে গল্পটি সম্পূর্ণ বিস্তারিতভাবে পুরোটা কাহিনী আপডেট করা হলো 

অসমাপ্ত এক প্রেমের কাহিনী বই


অসমাপ্ত এক প্রেমের কাহিনী 

সূচিপত্র 

      • প্রথম অধ্যায়: কাদা-মাটির দিনগুলো

      • ​১। সাহেব নগরের জোছনা রাত ও আমাদের লুকোচুরি
      • ২। হিজল তলার খেলা ও বিয়ের ভবিষ্যৎবাণী
      • ৩। দাদির ঘরে খুনসুটি ও মায়াবী সেই জোছনা
      • ৪। প্রথম প্রেম নিবেদন ও সুমির সেই সরল হাসি
      • ৫। বন্যার ভেলা ও তার দিয়ে জোড়া লাগানো চেইন
      • ৬। মাছ ধরার গল্প ও আমাদের সেই ভাগাভাগি
      • ৭। বিদ্যুৎহীন রাত ও উঠানে তারার মেলা
      • ৮। শৈশবের নিবিড় ঘনিষ্ঠতা ও সারল্য
      • ৯। সাহেব নগরের দুপুর, জোলাপাতি ও প্রেমের অঙ্কুরোদগম

      • দ্বিতীয় অধ্যায়: নীল বিষাদে ঘেরা আকাশ

      • ​১০। ঢাকা থেকে ভিসিডি প্লেয়ার ও গভীর রাতের সিনেমা
      • ১১। সাহেব নগরের আলো-বাতাসে প্রণয়ের গুঞ্জন
      • ১২। সাহেব নগরের আকাশে বাধার মেঘ ও সম্পর্কের যাতনা
      • ১৩। বিনামেঘে বজ্রপাত ও সাহেব নগরের কান্না
      • ১৪। পায়ের তলার মাটি সরে যাওয়া ও উৎসবের মাঝে হাহাকার
      • ১৫। বিষাদের ঘর ও এক জীবন্ত পাথর
      • ১৬। নরক যন্ত্রণা ও এক নিঃশব্দ বিদায়

      • তৃতীয় অধ্যায়: হৃদপিণ্ডে কুঠারাঘাত

      • ​১৭। পাশাপাশি ঘর ও এক জীবন্ত পাথর (উৎসবের আড়ালে বিষাদ)
      • ১৮। চরম যন্ত্রণা ও নদীর পাড়ের নির্বাক বিলাপ
      • ১৯। কবুল, লাল বেনারসি ও এক চূর্ণবিচূর্ণ পৃথিবী
      • ২০। দীর্ঘতম রাত ও এক নিঃশব্দ বিলাপ

      • চতুর্থ অধ্যায়: পবিত্রতা ও প্রতীক্ষা

      • ​২১। বাসর ঘরের বিদ্রোহ ও এক জ্যান্ত প্রতিমূর্তি
      • ২২। পবিত্রতার জয় ও এক চিলতে প্রশান্তি
      • ২৩। নাইওর নিতে যাওয়া ও নির্বাক চোখের মিলন
      • ২৪। অনড় হিমালয় ও বিচ্ছেদের সুর
      • ২৫। দুই মেরুর দুই পথিক ও এক দীর্ঘ নীরবতা

      • পঞ্চম অধ্যায়: হৃদয়ের টান ও এক নিঃস্বার্থ প্রস্তাব

      • ​২৬। দীর্ঘ বিরহ ও দুই প্রান্তের হাহাকার
      • ২৭। মরুর বুকে বৃষ্টি ও একটি জাদুকরী ফোন কল
      • ২৮। অন্তহীন কথামালা ও সময়ের বিস্মৃতি
      • ২৯। উদীয়মান সূর্যের বার্তা ও এক হৃদয়ের প্রশান্তি
      • ৩০। মনের ক্ষত ও এক অসমাপ্ত লড়াইয়ের ভয়
      • ৩১। আত্মত্যাগ ও এক অদ্ভূত প্রস্তাব
      • ৩২। অশ্রুসিক্ত সম্মতি ও অনন্ত প্রতীক্ষা
      • ৩৩। প্রতীক্ষার অবসান ও এক অপার্থিব মিলন
      • ৩৪। নিঝুম রাতের সাক্ষী ও এক অদেখা আঁধার
      • ৩৫। প্রাত্যহিক পবিত্রতা ও পুকুর ঘাটের অমলিন স্মৃতি
      • ৩৬। অনাকাঙ্ক্ষিত বাধা ও বিলের সেই শান্ত পথ
      • ৩৭। বিলের মাঝপথের সেই অপূর্ণ ইচ্ছা

      • ষষ্ঠ অধ্যায়: মেহেদী রাঙা বিষাদ

      • ​৩৮। ভাগ্যের নিষ্ঠুর খেলা ও মামার কঠিন প্রস্তাব
      • ৩৯। এক উভয় সংকট ও নীরব আত্মসমর্পণ
      • ৪০। হৃদয়ের বোঝাপড়া (শারমিনের সাথে আলাপ)
      • ৪১। বিসর্জনের দীর্ঘশ্বাস
      • ৪২। বিষাদের সানাই
      • ৪৩। অশ্রুভেজা মেহেদী
      • ৪৪। শেষ আর্তনাদ ও এক নিষ্ঠুর শপথ
      • ৪৫। মেঠো পথের শেষ প্রান্তে

      • সপ্তম অধ্যায়: জেদের আগুনে পুড়ে যাওয়া স্বপ্ন

      • ​৪৬। অভিমানে ভরা বিচ্ছেদ ও এক জেদি পরিণয়
      • ৪৭। দুটি সমান্তরাল পথ ও এক অসমাপ্ত উপাখ্যান

      • অষ্টম অধ্যায়: দশ বছরের ব্যবধান ও একটি শোকাতুর বিচ্ছেদ

      • ​৪৮। সময়ের স্রোতে বদলে যাওয়া জীবন
      • ৪৯। বাইজিদ: এক অদ্ভুত মায়ার বন্ধন
      • ৫০। নিয়তির নিষ্ঠুর খেলা ও বাইজিদের চিরবিদায়
      • ৫১। সুমির হাহাকার ও এক অপূরণীয় শূন্যতা

      • নবম অধ্যায়: স্মৃতির জানালায় দাঁড়িয়ে (উপসংহার)

      • ​৫২। শান্ত মোহনা ও পরিণত এক অনুভূতি
      • ৫৩। এক পবিত্র গন্তব্য ও হৃদয়ের প্রশান্তি
      • ৫৪। পরকালের প্রতীক্ষা ও ভালোবাসার চূড়ান্ত গন্তব্য

    বইয়ের লেখক এমএস মনির খান নিজেই 

    অসমাপ্ত এক প্রেমের কাহিনী

    প্রথম অধ্যায়: কাদা-মাটির দিনগুলো

    বইয়ের প্রারম্ভিক কথন

    ​আসসালামু আলাইকুম।

    ​প্রিয় পাঠক ভাই ও বোনেরা, আজ আপনাদের এমন এক বাস্তব জীবনের গল্প শোনাব, যা শুনে আপনাদের হৃদয়ে এক গভীর হাহাকার জন্ম নেবে। এটি এক চাচাতো ভাই ও বোনের চিরন্তন অথচ অসমাপ্ত প্রেমের কাহিনী।

    ​কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর থানার অন্তর্গত শ্রীকাইল ইউনিয়নের একটি শান্ত ও মায়াবী গ্রাম—সাহেব নগর। যে গ্রামটিকে ঘিরে আছে সবুজের সমারোহ আর মেঠো পথের আলপনা। এই গ্রামেরই ধুলোমাখা ধূলিকণায় শুরু হয়েছিল এক নামহীন সম্পর্কের প্রথম স্পন্দন। উসমান গনির ছেলে এম. এস. মনির খান আর তাঁরই আপন ছোট ভাই বাইজি মিয়া-র  মেয়ে সুমি। সম্পর্কের বিচারে তারা আপন চাচাতো ভাই-বোন হলেও, নিয়তি তাদের জন্য শৈশব থেকেই লিখে রেখেছিল এক অবিচ্ছেদ্য এবং এক অদ্ভুত মায়ার বন্ধন।

    ১। সাহেব নগরের জোছনা রাত ও আমাদের লুকোচুরি

    ​স্মৃতির পাতা উল্টালে আজ থেকে প্রায় ৫ বছর আগের দুটি ছোট শিশুর ছবি ফুটে ওঠে। তারা যেন একে অপরকে না দেখলে পাগল হয়ে যেত। সাহেব নগরের ধুলোমাখা গ্রামীণ পথে মনির যেখানেই যেত, সুমি তার পেছনে ছায়ার মতো লেগে থাকত।

    ​তখন সাহেব নগরের সেই দিনগুলোতে জোছনা রাত নামলে মনির আর সুমির আনন্দের সীমা থাকত না। যখন আকাশে রূপালী চাঁদ উঠত, তখন তারা দুজনে মিলে মেতে উঠত লুকোচুরি খেলায়। সারা গ্রাম যেন এক মায়ায় ঢেকে যেত, আর সেই আলো-আঁধারির মাঝে একজন আরেকজনকে খুঁজে বেড়াত। বাড়ির উঠান থেকে শুরু করে আনাচে-কানাচে চলত তাদের এই লুকোচুরি। সেই নিষ্পাপ সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল কেবলই আনন্দে ভরা।

    অসমাপ্ত এক প্রেমের কাহিনী|চাচাতো ভাই বোনের প্রেম কাহিনী



    ২। হিজল তলার খেলা ও বিয়ের ভবিষ্যৎবাণী

    ​তখন বাড়ির পাশে সেই বিশাল হিজল গাছটির নিচে বসে মনির আর সুমি দীর্ঘ সময় ধরে নানা রকম খেলাধুলা করত। তাদের এই একসাথে থাকা আর খেলাধুলার গভীর মিল দেখে একদিন রিতার মা অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন। একপর্যায়ে রিতার মা মনিরের মা আর সুমির মাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, 'ওদের দুইজনের মধ্যে অনেক মিল রে! ওরা যখন বড় হবে, তখন তোরা এদের দুইজনের বিয়ে দিয়ে দিস।'

    ​রিতার মায়ের সেই কথা শুনে তখন বাড়ির বড়রা সবাই হাসাহাসি করেছিল। কিন্তু মনির এই কথাটা নিজের কানে শুনেছিল। সেদিন থেকেই মনির মনে মনে এটাকে বাস্তব করার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল এবং সুমির প্রতি তার ভালোবাসা আরও বেড়ে গিয়েছিল।

    ৩। দাদির ঘরে খুনসুটি ও মায়াবী সেই জোছনা

    ​মনির আর সুমি প্রায় সময়ই দাদির ঘরে ঘুমাতে যেত। তারা দাদির দুই পাশে শুয়ে পড়ত আর দুইজনে মিলে চলত প্রচুর দুষ্টামি ও ঝগড়া। একদিন দাদির ঘরে দুষ্টামি করার সময় মনির সুমির মাথার কিছু চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলেছিল। তখন জানালার পাশ দিয়ে আসা উজ্জ্বল জোছনার আলোয় সুমির মুখের দিকে তাকিয়ে মনির বলে উঠেছিল, ‘তোর চুলগুলো কত সুন্দর! এই চুলই তো আমাকে পাগল করে দিয়েছে।’

    ​মনিরের মুখে হঠাৎ এমন কথা শুনে সুমি ভীষণ লজ্জা পেয়েছিল। সেই রাতের জানালার আলো আর তাদের ছোট ছোট খুনসুটি দাদির ঘরের পরিবেশকে এক মায়াবী রূপ দিয়েছিল, যা আজও মনিরের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে।

    ৪। প্রথম প্রেম নিবেদন ও সুমির সেই সরল হাসি

    ​আরেকদিনের কথা, মনির হঠাৎ করেই সুমিকে মনের গহীনের কথাটি বলে ফেলেছিল। সে বলেছিল, ‘সুমি, আমি তোকে অনেক ভালোবাসি।’ কথাটি শুনে সুমি একদমই অবাক হলো না, বরং খিলখিল করে হাসতে হাসতে সেই কথা নিজের মা আর মনিরের মার কাছে গিয়ে বলে দিল। সুমি হাসতে হাসতে বলল, ‘কাকি, জানেন, মনির ভাই আমাকে ভালোবাসে! আপনিই বলেন কাকি, চাচাতো ভাই-বোন কি এভাবে ভালোবাসে?’

    ​এ কথা শুনে মনিরের মা মনিরকে বেশ একটা দৌড়ানি দিলেন এবং বকা দিয়ে বললেন, ‘ও তো এখনো ছোট, ভালো-মন্দ বোঝে না, কেন ওকে এসব কথা বলতে গেলি?’ কিন্তু সুমি তাতেও থামেনি; সে মজার ছলে অনেকের কাছেই বলে বেড়াত যে মনির ভাই তাকে ভালোবাসে। এমন দুষ্টুমি আর সীমাহীন সরলতার মাঝেই তাদের সেই ভালোবাসা তিলে তিলে গভীর হতে শুরু করল।

    ৫। বন্যার ভেলা ও তার দিয়ে জোড়া লাগানো চেইন

    ​এক বছর গ্রামজুড়ে বিশাল বন্যা দেখা দিল। বন্যার পানি এমনকি তাদের সেই চেনা হিজল গাছের নিচ পর্যন্ত চলে এসেছিল। মনির আর সুমি মিলে তখন কলাগাছ দিয়ে ভেলা বানিয়ে সেই পানিতে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াত। হঠাৎ একদিন খেলাচ্ছলে মনিরের হাত লেগে সুমির গলার রুপার চেইনটি ছিঁড়ে গেল। চেইন ছিঁড়ে যাওয়ায় সুমি খুব রাগ করল এবং জেদ ধরে বসল। সুমি মনিরকে বলল, 'আপনি হয় আমাকে নতুন চেইন কিনে দেবেন, না হয় এটা ঠিক করে দেবেন!'

    ​মনির তখন সুমিকে শান্ত করার জন্য বলল, 'আচ্ছা ঠিক আছে, রাগ করিস না।' এরপর মনির একটি চিকন গুনা (তার) দিয়ে চেইনটি কোনোমতে জোড়া দিয়ে সুমির হাতে দিয়ে বলল, 'নে, তোর চেইন ঠিক করে দিয়েছি, এবার আর রাগ করিস না।'

    ৬। মাছ ধরার গল্প ও আমাদের সেই ভাগাভাগি

    ​শৈশবের এক দুপুরে মনির আর সুমি মিলে শখ করে মাছ ধরতে গিয়েছিল। সারাটা সময় অনেক চেষ্টার পর শেষমেশ তারা দুজনে মিলে একটি মাছ ধরল। সেই মাছ নিয়ে আনন্দ করতে করতে বাড়িতে আসার পর সুমি এক দারুণ দাবি করে বসল। সে বলল যে মাছটি তাকে ভাগ করে দিতে হবে।

    ​সুমি মনিরকে বায়না ধরে বলল, ‘মাছটা কেটে আমাকে ভাগ দিন।’ মনিরের কাছে সুমির আবদার ছিল সবকিছুর উপরে। তাই মাছটি সমান দুই ভাগে কাটা হলো। সুমি তার ভাগের অংশটি হাতে পেয়ে বিজয়ী এক হাসি দিল এবং হাসিমুখে নিজের ভাগ নিয়ে বাড়ির দিকে চলে গেল। সেই ছোট্ট একটি মাছের ভাগ পাওয়ার আনন্দ আজও মনিরের মনে অমলিন হয়ে আছে।

    ৭। বিদ্যুৎহীন রাত ও উঠানে তারার মেলা

    ​তখনকার সময় গ্রাম বাংলায় বিদ্যুৎ এসে পৌঁছায়নি। গ্রীষ্মকাল এলে অসহ্য গরমে ঘরের ভেতর থাকা দায় হয়ে পড়ত; নিথর বাতাসে দম বন্ধ হয়ে আসত। তাই রাতের বেলা প্রশান্তির খোঁজে বাড়ির সবাই মিলে উঠানে পাটি পেতে শুয়ে পড়ত। খোলা আকাশের নিচে মৃদু বাতাসের ছোঁয়ায় মনির আর সুমিও সবার সাথে বাইরে ঘুমাত।

    ​মাথার ওপরে অগণিত তারার মেলা আর চারপাশের শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশের মাঝে সেই উঠানে ঘুমানোর রাতগুলো ছিল দারুণ আনন্দের। আকাশের পানে তাকিয়ে নক্ষত্র গোনা আর গল্প করতে করতে কখন যে তারা ঘুমের দেশে তলিয়ে যেত, তা টেরই পেত না। শৈশবের সেই তপ্ত গরমেও বাইরের ঐ খোলা বাতাস আর মায়াবী রাতগুলো আজ মনিরের কাছে এক অমূল্য স্মৃতি।

    অসমাপ্ত এক প্রেমের কাহিনী|চাচাতো ভাই বোনের প্রেম কাহিনী



    ৮। শৈশবের নিবিড় ঘনিষ্ঠতা ও সারল্য

    ​শৈশবের সেই দিনগুলোতে মনির আর সুমি এমনভাবে বড় হতে লাগল যে, তাদের মধ্যে কোনো সংকোচ ছিল না, ছিল না কোনো পর্দার অন্তরায়। সেই বয়সের সারল্য এতটাই গভীর ছিল যে, তারা যখন ৯ বছর বয়সের কোঠায় পা রেখেছে, তখনও তাদের মধ্যে কোনো আড়াল তৈরি হয়নি।

    ​এমনকি তারা যখন প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে যেত, তখনও একজন আরেকজনকে ছেড়ে যেত না। একই জায়গায় বসে নির্দ্বিধায় কাজ সারত তারা—শৈশবের সেই নিবিড় ঘনিষ্ঠতায় কোনো লজ্জা বা দ্বিধা কোনোদিন স্থান পায়নি। একে অপরের প্রতি এই যে অগাধ নির্ভরতা এবং স্বচ্ছতা, এটাই ছিল তাদের একসাথে বেড়ে ওঠার সবচেয়ে সুন্দর ও প্রথম ধাপ। এই সারল্যই বুঝিয়ে দেয় তাদের আত্মার বন্ধন কতটা প্রাচীন আর মজবুত ছিল।

    ৯। সাহেব নগরের দুপুর, জোলাপাতি ও প্রেমের অঙ্কুরোদগম

    ​সাহেব নগরের সেই শান্ত দুপুরগুলোতে তাদের প্রিয় খেলা ছিল ‘জোলাপাতি’। মাটির ভাঙা হাঁড়ি-পাতিল, ধুলোবালি আর লতা-পাতা দিয়ে সাজানো সেই সংসারে মনির সাজত স্বামী আর সুমি সাজত তার লক্ষ্মী ঘরনি। মামুন, রিতা, শিপা আর রমজানের মতো খেলার সাথীরাও তাদের সাথে মেতে উঠত সেই খেলায়। তারা সবাই মিলে যখন লুকোচুরি খেলত, তখন হাজারো ভিড়ের মাঝেও মনিরের চোখ শুধু সুমিকে খুঁজত। সুমি সবসময় চাইত মনিরই যেন তাকে খুঁজে বের করে; আর মনিরও সুমিকে ছাড়া অন্য কাউকে খুঁঁজতে চাইত না।

    ​এভাবেই কাটছিল সাহেব নগরের দিনগুলো। সময় গড়িয়ে যখন তাদের বয়স ১১ বছর ছুঁইছুঁই, তখন তাদের সেই অবুঝ বন্ধুত্বে এক অন্যরকম ভালোবাসার দোলা লাগল। কৈশোরে পা দেওয়ার সাথে সাথেই মনের কোণে এক অজানা প্রেমের অঙ্কুরোদগম হলো। তারা বুঝতে পারল, এটা আর কেবল খেলাধুলা বা বন্ধুত্ব নেই। একে অপরকে না দেখলে বুকের ভেতর এক অসহ্য হাহাকার শুরু হয়, কথা না বললে দম বন্ধ হয়ে আসে। সেই ১১ বছর বয়সেই তারা মনে মনে এক ভীষণ প্রতিজ্ঞা করেছিল—দুনিয়া যেদিকেই যাক, তারা একে অপরকে ছাড়া বাঁচবে না। কিন্তু তারা জানত না, এই সাহেব নগর গ্রামের মেঠো পথেই তাদের জন্য অপেক্ষা করছে এক দীর্ঘ বিরহ আর ভাঙনের গল্প।

            [প্রথম অধ্যায় সমাপ্ত]

         অসমাপ্ত এক প্রেমের কাহিনী

    দ্বিতীয় অধ্যায়: নীল বিষাদে ঘেরা আকাশ

    ১০। ঢাকা থেকে ভিসিডি প্লেয়ার ও গভীর রাতের সিনেমা

    ​তখন মনির আর সুমি একটু বড় হয়ে উঠেছে (প্রায় ১০-১২ বছর)। কৈশোরের শুরুতেই মনিরকে কর্মজীবনে ঢাকা চলে যেতে হয়েছিল। কিন্তু কাজের ফাঁকে সে যখনই ঢাকা থেকে গ্রামে আসত, সুমি তার কাছে এক দারুণ বায়না ধরত—তাকে সিনেমা দেখাতে হবে। সুমির এই আবদার মেটানোর জন্য মনির গ্রাম থেকে ভিসিডি (VCD) প্লেয়ার আর টেলিভিশন ভাড়া করে নিয়ে আসত। সারাদিন বাড়ির সবাই মিলে একসাথে বাংলা সিনেমা দেখত।

    ​কিন্তু আসল আনন্দটা শুরু হতো অনেক গভীর রাতে। যখন বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়ত, তখন মনির আর সুমি দাদির ঘরে একা একা সিনেমা দেখত। ভিসিডির রূপালী পর্দার আলোয় দাদির ঘরটা এক অন্যরকম মায়াবী রূপ পেত। সেই নিস্তব্ধ রাতে তাদের সময়গুলো কাটত এক গভীর অনুভূতি আর প্রশান্তিতে।

    ১১। সাহেব নগরের আলো-বাতাসে প্রণয়ের গুঞ্জন

    ​আস্তে আস্তে সাহেব নগর গ্রামের আলো-বাতাসে মনির আর সুমি যখন বড় হতে লাগল, তখন তাদের সেই শৈশবের ‘স্বামী-স্ত্রী’ খেলা কখন যে বাস্তবে রূপ নিল, তারা নিজেরাও তা টের পায়নি। ১১ থেকে ১২ বছর বয়সটা ছিল এক অদ্ভুত মায়ার সময়। সেই সময় তাদের একজনের প্রতি অন্যজনের যে টান তৈরি হয়েছিল, তা আর কেবল চাচাতো ভাই-বোনের স্নেহের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা এক গভীর ভালোবাসায় রূপ নিয়েছিল।

    ​তাদের এই অগাধ মোহাব্বতের কথা গ্রামের মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগল না। সাহেব নগরের মেঠো পথ থেকে শুরু করে চায়ের আড্ডা—সবখানেই তাদের এই অমর প্রেমের গুঞ্জন শোনা যেতে লাগল। সেই সহজ-সরল গ্রামে তাদের এই ভালোবাসা যেমন প্রশংসা কুড়িয়েছিল, তেমনি হয়তো অলক্ষ্যে কিছু বাধার মেঘও জমতে শুরু করেছিল।

    ১২। সাহেব নগরের আকাশে বাধার মেঘ ও সম্পর্কের যাতনা

    ​কিন্তু গ্রামবাংলার রক্ষণশীল সমাজে এই অমর প্রেমের পরিণতি সব সময় সুখকর হয় না। যখনই তাদের এই গভীর মোহাব্বতের খবর দুই পরিবারের কানে পৌঁছাল, শুরু হলো তীব্র অশান্তি। সাহেব নগরের শান্ত আকাশ যেন বাধার মেঘে ঢেকে গেল। মনিরের মা এবং সুমির মা—কেউই এই সম্পর্ক মেনে নিতে পারলেন না। চাচাতো ভাই-বোনের এই পবিত্র প্রেমকে তারা চরম পাপ হিসেবে গণ্য করতে লাগলেন।

    ​সুমির পরিবার থেকে তাকে কড়া শাসন করা শুরু হলো, আর মনিরকেও বাড়ির বড়দের নজরে নজরে থাকতে হলো। তাদের একে অপরের প্রতি নিবিড় ঘনিষ্ঠতায় যেন এক অদৃশ্য ভাঙনের সুর বেজে উঠল। শৈশবের সেই সারল্য আর কৈশোরের মায়াবী চাহনি এখন এক অসহায় বিরহে রূপ নিল। সাহেব নগর গ্রামের মেঠো পথ তাদের জন্য হয়ে উঠল এক অসহ্য হাহাকারের গল্প।

    ১৩। বিনামেঘে বজ্রপাত ও সাহেব নগরের কান্না

    ​সাহেব নগরের অশান্তির মাঝে এরই মধ্যে একদিন বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো এক খবর এলো। সুমির বাবা বায়জিদ মিয়া সিদ্ধান্ত নিলেন, সুমিকে আর এই গ্রামে রাখা নিরাপদ নয়। তার জেদ, অবাধ্যতা আর মনিরের প্রতি এই গভীর টান রুখতে তিনি তড়িঘড়ি করে অন্য এক ছেলের সাথে সুমির বিয়ে ঠিক করে ফেললেন। যেদিন বিয়ের কথা পাকাপাকি হলো, সাহেব নগরের শান্ত দুপুর যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।

    ​সেদিন মনির ছিল গ্রামের এক ফসলি জমিতে। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সে যখন হাড়ভাঙা খাটুনি দিচ্ছিল, তখন সুমির বোন শিপা দৌড়ে এলো মাঠের আইল ধরে। তার চোখেমুখে ছিল রাজ্যের আতঙ্ক। হাপাতে হাপাতে সে জমির কিনারায় দাঁড়িয়ে বলল, “মনির ভাই, সর্বনাশ হয়ে গেছে! সুমি আপার বিয়া ঠিক হয়ে গেছে!” শিপার সেই একটি বাক্য যেন মনিরের সারা দুনিয়াটা মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার করে দিল।

    ১৪। পায়ের তলার মাটি সরে যাওয়া ও উৎসবের মাঝে হাহাকার

    ​শিপার সেই একটি বাক্য মনিরের কানে যেন তপ্ত সিসার মতো বিঁধল। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছে, আর বিশাল আসমানটা ভেঙে তার মাথার ওপর পড়ছে। চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে এলো, চারপাশের চেনা জগৎটা মুহূর্তেই অচেনা হয়ে গেল।

    ​মনির আর স্থির থাকতে পারল না; পাগলের মতো দৌড়ে বাড়ির দিকে ছুটল। মাঠের আইল, মেঠো পথ—সব পেছনে ফেলে সে যখন বাড়িতে পৌঁছাল, দেখল সেখানে অন্য এক দৃশ্য। বাড়ির ভেতর তখন সুমির বিয়ের সাজসাজ রব। চারদিকে উৎসবের আমেজ, মানুষের আনাগোনা আর ব্যস্ততা—কিন্তু এই সবকিছুর মাঝে মনিরের বুকের ভেতরটা যেন এক নিস্তব্ধ গোরস্থানে পরিণত হয়েছিল।

    ১৫। বিষাদের ঘর ও এক জীবন্ত পাথর

    ​বাড়ির হইচই এড়িয়ে মনির আড়ালে গিয়ে দেখল, সুমি একটি ঘরে একা শুয়ে আছে। হয়তো সারা বেলা কেঁদে কেঁদে ক্লান্ত হয়ে সে অবুঝের মতো ঘুমিয়ে পড়েছে, অথবা যন্ত্রণায় নির্জীব হয়ে পড়ে আছে। মনির দরজার আড়াল থেকে এক দৃষ্টিতে সুমির দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, কেউ যেন এক ধারালো বিষাক্ত ছুরি দিয়ে তার কলিজাটা এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিচ্ছে।

    ​বুকের ভেতর এক অব্যক্ত হাহাকার জমে উঠল, কিন্তু সেই আনন্দ-উৎসবের মাঝে চিৎকার করে কাঁদার কোনো উপায় ছিল না। সেই মরণঘাতি যন্ত্রণার মুহূর্ত থেকে মনির যেন এক জীবন্ত পাথরে পরিণত হলো। তার চিরচেনা হাসিখুশি মুখটা এক নিমিষেই গাঢ় বিষাদে কালো হয়ে গেল। সাহেব নগরের আকাশে তখন বাদ্যি বাজছিল, কিন্তু মনিরের জগতে তখন কেবলই চিরস্থায়ী অন্ধকারের নীরবতা।

    ১৬। নরক যন্ত্রণা ও এক নিঃশব্দ বিদায়

    ​সবচেয়ে বেশি কষ্ট হলো যখন মনির দেখল, বিয়ের তারিখ ঠিক হওয়ার পর থেকে সুমি আর তার সাথে কোনো কথা বলছে না। সুমির এই নীরবতা মনিরের বুকে তীরের মতো বিঁধছিল। সে কিছুতেই বুঝতে পারছিল না—সুমি কি ভয়ে বা চাপে কথা বলছে না, নাকি অভিমানে তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে? বিয়ের আগের দিনগুলো মনিরের কাছে নরক যন্ত্রণার মতো মনে হতে লাগল।

    ​বাড়ির সবাই যখন সুমির বিয়ের উৎসব নিয়ে ব্যস্ত, তখন মনির বাড়ির এক নিঃসঙ্গ কোণে বসে একা একা নিরবে চোখের জল ফেলছিল। যে মানুষটির সাথে সারা জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখেছিল, আজ তাকেই নিজের চোখের সামনে অন্য কারো হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তুতি দেখতে হচ্ছে—এই কষ্টের চেয়ে বড় কোনো যন্ত্রণা পৃথিবীতে আর কী হতে পারে! তার প্রতিটি নিশ্বাস যেন এক একটি অসহ্য দীর্ঘশ্বাস হয়ে সাহেব নগরের আকাশকে ভারী করে তুলছিল।

    অসমাপ্ত এক প্রেমের কাহিনী | চাচাতো ভাই বোনের প্রেম কাহিনী |অসমাপ্ত এক প্রেমের গল্প |



               [দ্বিতীয় অধ্যায় সমাপ্ত]

          অসমাপ্ত এক প্রেমের কাহিনী

    তৃতীয় অধ্যায়: হৃদপিণ্ডে কুঠারাঘাত

    ১৭। পাশাপাশি ঘর ও এক জীবন্ত পাথর

    ​বিয়ের দিন ঘনিয়ে এল। সাহেব নগর গ্রামে আজ উৎসবের ধুম। চারিদিকে সানাইয়ের সুর, মানুষের কোলাহল আর আনন্দ—কিন্তু মনিরের কাছে এই সুর যেন ছিল এক একটি অসহ্য বিলাপের মতো। মনিরের ঘর আর সুমির ঘর একদম পাশাপাশি, একই উঠানে; তাই প্রতিবেশীদের আনন্দ আর হাসাহাসি তার বুকের ভেতর তীরের মতো বিঁধছিল।

    ​সবাই যখন বিয়ের আয়োজনে ব্যস্ত, মনির তখন এক জীবন্ত পাথরে পরিণত হয়েছে। তার পেটে দানাপানি নেই, চোখে ঘুম নেই, মুখে কোনো কথা নেই। তার চিরচেনা হাসিখুশি মুখটা এক নিমিষেই বিষাদে কালো হয়ে গেছে। সাহেব নগরের আকাশে তখন বাদ্যি বাজছিল, কিন্তু মনিরের জগতে তখন কেবলই চিরস্থায়ী অন্ধকারের নীরবতা। তার প্রতিটি নিশ্বাস যেন এক একটি অসহ্য দীর্ঘশ্বাস হয়ে সাহেব নগরের আকাশকে ভারী করে তুলছিল।

    ১৮। চরম যন্ত্রণা ও নদীর পাড়ের নির্বাক বিলাপ

    ​এরই মধ্যে সাহেব নগর গ্রামে বরযাত্রী আসার সময় হলো। বাড়ির সবাই যখন সেই উৎসবের আনন্দে আত্মহারা, হঠাৎ সুমির বাবা আলিফ খাঁ মনিরকে ডেকে বললেন, “ভাতিজা, বরযাত্রী তো চলে আসছে, তুমি গিয়ে গেটে দাঁড়াও। সবাইকে রিসিভ করে ভেতরে নিয়ে আসো।”

    ​চাচুর সেই কথাটা মনিরের কানে তপ্ত বিষের মতো বিঁধল। যে মানুষটিকে সে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসে, যে মানুষটি তার সারা জীবন কাটানোর স্বপ্ন ছিল, তাকে যে লোকটা কেড়ে নিতে এসেছে, তাকেই বরণ করে নিতে হবে? প্রথমে রাজি হতে না চাইলেও, বড়দের সম্মান আর সাহেব নগরের পারিবারিক সম্পর্কের খাতিরে সে না করতে পারল না। এক বুক হাহাকার আর পাথর চাপা কষ্ট নিয়ে সে বাড়ির গেটে গিয়ে দাঁড়াল।

    ​হাসিমুখে বরযাত্রীদের বরণ করার অভিনয় করতে করতে তার ভেতরটা যেন ধীরে ধীরে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছিল। তার প্রতিটি হাসি ছিল এক একটি অসহ্য দীর্ঘশ্বাস। বরযাত্রী ভেতরে ঢোকার পর মনির আর সেখানে এক মুহূর্তও স্থির থাকতে পারল না। বাড়ির কোলাহল আর সুমির বিয়ের সানাইয়ের সুর পেছনে ফেলে সে গ্রামের সেই নির্জন নদীর পাড়ে গিয়ে একা বসে রইল। জনশূন্য নদীর পাড়ে বসে সে অঝোরে কাঁদতে লাগল, যেন তার চোখের জলেই সাহেব নগরের এই নদীর জল বেড়ে যাবে। তার সেই নির্বাক বিলাপের সাক্ষী হয়ে রইল কেবল সাহেব নগরের শান্ত আকাশ আর নদীর পাড়ের মৃদু বাতাস।

    ১৯। কবুল, লাল বেনারসি ও এক চূর্ণবিচূর্ণ পৃথিবী

    ​ওদিকে সাহেব নগরের সেই উৎসবমুখর বাড়িতে সুমির বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেল। কাজি সাহেবের 'কবুল' শব্দটা হয়তো নদীর পাড়ে বসা মনিরের কানে পৌঁছায়নি, কিন্তু তার হৃদয়ে সেই মরণঘাতী কম্পন ঠিকই অনুভূত হচ্ছিল। একটু পরেই বেজে উঠল বিদায়ের করুণ ঘণ্টা। সুমির স্বামী সুমিকে নিয়ে নতুন জীবনের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।

    ​জনশূন্য নদীর পাড় থেকে মনির অপলক দৃষ্টিতে দেখতে পেল সেই দৃশ্যটা—যাকে পাওয়ার জন্য সে শৈশব থেকে রঙিন স্বপ্ন বুনেছে, সে আজ কনের সাজে লাল বেনারসি পরে অন্য কারো গাড়িতে করে অচেনা পথে চলে যাচ্ছে। গাড়ির ধুলো ওড়ার সাথে সাথে মনিরের মনে হলো, তার পুরো পৃথিবীটা বুঝি চুরমার হয়ে মাটির সাথে মিশে গেছে। তার বুক ফেটে কান্না আসছিল, কিন্তু কাঁদার শক্তিটুকুও যেন সে হারিয়ে ফেলেছে; সে কেবল সাহেব নগরের শান্ত নদীর দিকে তাকিয়ে এক জীবন্ত পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল।

    অসমাপ্ত এক প্রেমের কাহিনী | চাচাতো ভাই বোনের প্রেম কাহিনী |অসমাপ্ত এক প্রেমের গল্প |



    ২০। দীর্ঘতম রাত ও এক নিঃশব্দ বিলাপ

    ​সন্ধ্যা নেমে এল साहब नगर গ্রামের আকাশে। নদীর পাড়ে নিস্তব্ধ হয়ে বসা মনিরকে (বড় মনির, লুঙ্গি ও টি-শার্ট পরা) তার মা নদীর পাড় থেকে হাত ধরে টেনে অত্যন্ত স্নেহে ও কষ্টে বাড়িতে নিয়ে আসলেন। মা অনেক চেষ্টা করলেন তাকে কিছু খাওয়ানোর জন্য, এক বাটি ভাত হাতে নিয়ে অনেক অনুনয় করলেন, কিন্তু মনিরের গলা দিয়ে এক ঢোক জলও নামল না। সাহেব নগরের শান্ত নদীতে তখন আর বিলাপ শোনা যাচ্ছিল না, কেবল মনিরের বুকের ভেতরটা যেন এক নিস্তব্ধ গোরস্থানে পরিণত হয়েছিল।

    ​সারা রাত সে এক মুহূর্তের জন্যও ঘুমাতে পারল না। দাদির ঘরের বিছানায় শুয়ে ম্লান চাঁদ আর ভিসিডি প্লেয়ারের ক্যাসেটের দিকে তাকিয়ে সে কেবল শৈশবের স্মৃতি মনে করতে লাগল। তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল দাদির ঘরে সিনেমা দেখা, গভীর রাতে চড়ুইভাতি করা, আর শেষ দেখা সেই নির্জীব সুমির মুখ। যে সাহেব নগরের উঠোনে তারা এক সাথে খেলেছে, যে মেঠো পথে এক সাথে হেঁটেছে, আজ সেই পথে সুমি লাল বেনারসি পরে অন্য কারো গাড়িতে করে চিরদিনের জন্য চলে গেল।

    ​মনিরের কাছে সেই রাতটি ছিল জীবনের দীর্ঘতম এবং সবচেয়ে যন্ত্রণাময় এক রাত। সে কেবল ভাবছিল, বিধাতা কেন তাদের এমন এক কঠিন পরীক্ষায় ফেললেন? সাহেব নগরের আকাশে তখন বাদ্যি বাজছিল না, কিন্তু মনিরের জগতের বিষাদ তখন সাহেব নগরের বাতাসকে ভারী করে তুলছিল।

                [তৃতীয় অধ্যায় সমাপ্ত]

          অসমাপ্ত এক প্রেমের কাহিনী

    চতুর্থ অধ্যায়: পবিত্রতা ও প্রতীক্ষা

    ২১। বাসর ঘরের বিদ্রোহ ও এক জ্যান্ত প্রতিমূর্তি

    ​বিয়ের পরের দিনটি ছিল সাহেব নগর গ্রামের জন্য এক নতুন উত্তেজনার সকাল, কিন্তু মনিরের কাছে তা ছিল এক অতল বিষাদসিন্ধু। গতরাতের সেই অঝোর কান্না আর বিনিদ্র যন্ত্রণার রেশ তখনও তার চোখেমুখে স্পষ্ট। ঠিক সেই মুহূর্তে সুমির শ্বশুরবাড়ি থেকে একটি খবর এলো, যা মুহূর্তের মধ্যে পুরো গ্রামে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল।

    ​সুমির স্বামী ফোন করে সুমির বাবা আলিফ খাঁ-কে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য জানালো। সে রাগে ও ক্ষোভে ফেটে পড়ে অভিযোগ করল, “আপনার মেয়ে আমাকে সহ্যই করতে পারছে না। সে আমার কাছে তো আসেই না, এমনকি কাল রাতে আমাকে বাসর ঘরে প্রবেশ করতেও দেয়নি। সে যেন এক জ্যান্ত প্রতিমূর্তি হয়ে এক কোণে বসে আছে, যার ভেতরে কোনো প্রাণ নেই।” সুমির এই নীরব বিদ্রোহ সাহেব নগরের মানুষের কাছে বিস্ময় হলেও, নদীর পাড়ে বসে থাকা মনির ঠিকই বুঝতে পারল—সুমি আসলে তার হৃদয়ের টানেই নিজেকে অন্য কারো হতে দিচ্ছে না।

    ২২। পবিত্রতার জয় ও এক চিলতে প্রশান্তি

    ​এই খবর যখন সাহেব নগরের বাতাসে ভাসতে ভাসতে মনিরের কানে পৌঁছালো, তার বিষণ্ণ পাথুরে মনে এক চিলতে প্রশান্তির ছোঁয়া লাগল। এক অদ্ভুত ভালো লাগা আর পরম তৃপ্তি তাকে ঘিরে ধরল। মনির বুঝতে পারল—সুমি কেবল শরীরের চাপে অন্য এক ঘরে গেছে ঠিকই, কিন্তু তার আত্মা আর পবিত্রতা আজও কেবল মনিরের জন্যই তোলা আছে।

    ​অন্য কোনো পুরুষ তাকে স্পর্শ করতে পারেনি, এই সত্যটুকু মনিরের ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে মলমের মতো কাজ করল। সুমির এই অবাধ্যতা, এই জেদ আসলে কোনো সাধারণ জেদ নয়; এটি ছিল মনিরের প্রতি তার ভালোবাসার এক বিশাল মৌন প্রতিবাদ। সাহেব নগরের নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে মনিরের মনে হলো, যুদ্ধে হেরে গিয়েও সে যেন এক বিশাল জয় পেয়েছে।

    ২৩। নাইওর নিতে যাওয়া ও নির্বাক চোখের মিলন

    ​এরই মধ্যে সাহেব নগরের প্রথা অনুযায়ী সুমিকে তার বাবার বাড়িতে ফিরিয়ে আনার (নাইওর) সময় হলো। সুমির বাবা আলিফ খাঁ মনিরকে ডেকে বললেন, “ভাতিজা, সুমিকে আনতে তো আমাদের যেতেই হবে। তুমিও আমাদের সাথে চলো, একা ভালো লাগবে না।”

    ​মনির প্রথমে খুব শক্তভাবে না করে দিল। যে দৃশ্য তাকে তিলে তিলে মারছে, যে শ্বশুরবাড়ির কথা ভাবলে তার কলিজা শুকিয়ে যায়, সেখানে সে পুনরায় নিজেকে ফেলতে চায়নি। কিন্তু চাচুর করুণ অনুরোধ আর পরিবারের সবার চাপে শেষমেশ সে রাজি হতে বাধ্য হলো।

    ​এক বুক দুরুদুরু কাঁপন আর অজানা আতঙ্ক নিয়ে মনির যখন সুমির শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছালো, তখন সেখানে এক অদ্ভূত নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিল। কিন্তু সুমি যখনই উঠোনে মনিরকে দেখল, তার সেই বিষাদে মলিন হয়ে যাওয়া মুখে এক মুহূর্তের জন্য যেন হাজার সূর্যের আলো ফুটে উঠল। ঠিক তেমনি মনিরও সুমিকে এক নজর দেখে এক দীর্ঘস্থায়ী প্রশান্তি পেল। সবার মাঝখানে দাঁড়িয়েও তাদের সেই চাউনি আর চোখের ভাষায় হাজারো না বলা কথা, অভিমান আর ভালোবাসা আদান-প্রদান হয়ে গেল—যা অন্য কেউ টেরও পেল না।

    ২৪। অনড় হিমালয় ও বিচ্ছেদের সুর

    ​সুমি লোকদেখানো ভাবে তার স্বামীকে নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে আসলো বটে, কিন্তু তার ভেতরের সিদ্ধান্ত ছিল পাহাড়ের মতো অটল। বাড়িতে পা রেখেই সে পরিষ্কার জানিয়ে দিল, “আমি আর এই স্বামীর সংসার করব না।” সাহেব নগরের সেই শান্ত পরিবেশে যেন এক প্রলয় শুরু হলো। বাড়ির বড়রা তাকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করল, সমাজের লোকলজ্জার দোহাই দিল, শাসনের ভয়ও দেখালো—কিন্তু সুমি ছিল হিমালয়ের মতো অনড়। তার মনে মনে তখন কেবলই একটি নাম জপছিল—মনির।

    ​এভাবে যন্ত্রণাময় দীর্ঘ দুই মাস কাটল। সুমি আর এক মুহূর্তের জন্যও স্বামীর ঘরে ফিরল না। অবশেষে সেই অমিল, মানসিক দূরত্ব আর সুমির দৃঢ় অবস্থানের কারণে তাদের আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ বা ডিভোর্স হয়ে গেল। সুমি মুক্ত হলো ঠিকই, কিন্তু সাহেব নগরের আকাশে তখন এক বিষণ্ণ বিজয়ের সুর বাজছিল।

    ২৫। দুই মেরুর দুই পথিক ও এক দীর্ঘ নীরবতা

    ​ডিভোর্সের পর সুমি ভেঙে পড়ল না। সে চাইল না তার এই থমকে যাওয়া জীবনের বোঝা বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওপর পড়ুক। এক বুক আত্মসম্মান আর জেদ নিয়ে সে একাই পাড়ি জমালো ঢাকা শহরে। উদ্দেশ্য একটাই—নিজের পায়ে দাঁড়ানো এবং নিজের পরিচয় নিজে গড়া।

    ​অন্যদিকে মনিরও বিষাদ আর ভাগ্যের সন্ধানে পাড়ি জমালো প্রবাসের দূর পরবাসে। দুই জন আজ পৃথিবীর দুই প্রান্তে, মাঝখানে পড়ে রইল সাহেব নগরের সেই শান্ত নদী আর ধুলোমাখা পথের অসমাপ্ত সব স্মৃতি। দীর্ঘ তিনটি বছর—তাদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ ছিল না, ছিল না কোনো খবরাখবর। সাহেব নগরের আকাশে কতবার চাঁদ উঠল আর ডুবল, কিন্তু তাদের দেখা হলো না। তবে নিয়তি যার নাম হৃদয়ের গভীরতম কোণে লিখে রেখেছে, তাকে কি চাইলেই ভুলে থাকা এত সহজ? সময় বয়ে চলল, কিন্তু স্মৃতির ক্ষতগুলো তখনও সতেজ রয়ে গেল।

    চাচাতো ভাই বোনের প্রেম কাহিনী
    চরিত্র আসল ছবি ----------এম এস মনির খান             -------------------------        সুমি


                [চতুর্থ অধ্যায় সমাপ্ত]

          অসমাপ্ত এক প্রেমের কাহিনী

    পঞ্চম অধ্যায়: হৃদয়ের টান ও এক নিঃস্বার্থ প্রস্তাব

    ২৬। দীর্ঘ বিরহ ও দুই প্রান্তের হাহাকার

    ​ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাসে মনির আর সুমি এখন দুই মেরুর বাসিন্দা। মনির প্রবাসের তপ্ত মরুভূমিতে নিজের হাড়ভাঙা খাটুনি আর ঘাম ঝরাচ্ছে, আর সুমি ঢাকা শহরের যান্ত্রিক ভিড়ে নিজেকে টিকিয়ে রাখার এক অসম লড়াই করছে। দেখতে দেখতে বিচ্ছেদের দীর্ঘ তিনটি বছর কেটে গেল। এই তিন বছরে তাদের মধ্যে কোনো কথা হয়নি, কোনো চিঠির আদান-প্রদান হয়নি—যেন তারা একে অপরের জন্য চিরতরে হারিয়ে গেছে।

    ​কিন্তু প্রবাসের নির্জন রাতে মনির যখন মরুভূমির বিশাল আকাশের দিকে তাকাত, তখন সাহেব নগর গ্রামের সেই মেঠো পথ, দাদির ঘরের স্মৃতি আর সুমির সেই কান্নারত মুখটা তার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ভেসে উঠত। ঠিক একইভাবে সুমিও হয়তো ঢাকার কোনো এক ভাড়া বাসার জানালার গ্রিল ধরে সাহেব নগরের বাঁশঝাড় আর মনিরের কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলত। দূরত্ব বাড়লেও হৃদয়ের টান যে এক ইঞ্চিও কমেনি, তা কেবল তারাই জানত।

    ২৭। মরুর বুকে বৃষ্টি ও একটি জাদুকরী ফোন কল

    ​মানুষ বলে, যার সাথে আত্মার টান থাকে, বিধাতা তাকে কোনো না কোনোভাবে মিলিয়ে দেন। সাহেব নগরের সেই ধুলোমাখা স্মৃতিরা বুঝি আকাশ-বাতাস এক করে প্রার্থনা করেছিল। আর তাই হঠাৎ করেই একদিন এক অবিশ্বাস্য মিরাকলের মতো মনির সুমির কন্টাক্ট নম্বরটা জোগাড় করে ফেলল।

    ​হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি নিয়ে মনির যখন প্রথম ফোন কলটা করল, ওপাশে ফোন রিসিভ হতেই এক দীর্ঘ, ভারী নীরবতা। তারপর কোনো কথা নয়, কেবল শোনা গেল সুমির বুকফাটা কান্নার শব্দ। তিনটি বছরের জমে থাকা সব অভিমান, না বলা কথা আর দীর্ঘশ্বাস যেন সেই কান্নার স্রোতে ভেসে গেল। সেই একটি ফোনেই সব দূরত্ব ঘুচে গেল। আবার শুরু হলো তাদের সেই কথা বলা, গভীর অনুভূতির আদান-প্রদান। মরুভূমির তপ্ত বুকে হঠাৎ নামা বৃষ্টির মতো তাদের প্রেম আবার সজীব আর প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।

    ২৮। অন্তহীন কথামালা ও সময়ের বিস্মৃতি

    ​সেই মিরাকলের পর থেকে মনিরের দিনগুলো কাটত কেবল সুমির সাথে কথা বলার তীব্র অপেক্ষায়। প্রবাসের তপ্ত মরুভূমিতে সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি আর ঘাম ঝরানো পরিশ্রম শেষে যখন সে রাতে সুমিকে ফোন দিত, তখন পৃথিবীর অন্য সব কিছু যেন তুচ্ছ হয়ে যেত। সময়ের যেন আর কোনো হিসেব থাকত না তাদের কাছে।

    ​একবার কথা শুরু হলে সাত-আট ঘণ্টা কীভাবে মায়াবী ঘোরের মতো পার হয়ে যেত, তারা টেরও পেত না। ফোনের ওপাশে ঢাকা শহরের এক যান্ত্রিক ঘরে সুমি আর এপাশে প্রবাসের নির্জন মরুপ্রান্তরের ঘরে মনির—মাঝখানের হাজার মাইলের দূরত্ব যেন একটি ছোট্ট মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে মিলিয়ে যেত। দুই প্রান্তের দুই হৃদয়ের জমে থাকা তিন বছরের না বলা সব কথা, মান-অভিমান আর আগামী দিনের স্বপ্ন যেন শেষই হতে চাইত না। সাহেব নগরের সেই চেনা স্মৃতিগুলো তখন প্রবাসের আকাশে শুকতারা হয়ে জ্বলত।

    ২৯। উদীয়মান সূর্যের বার্তা ও এক হৃদয়ের প্রশান্তি

    ​একদিন প্রবাসের এক ক্লান্ত দুপুরে সুমি মনিরের নাম্বারে একটি দীর্ঘ এবং মায়াবী এসএমএস পাঠাল। সুমি তার মনের গভীরে সযত্নে লুকিয়ে রাখা কথাগুলো বলতে শুরু করেছিল ভোরের উদীয়মান সূর্যের এক অপূর্ব উপমা দিয়ে। সে লিখেছিল—

    "উদিত সূর্যের প্রথম আলো যেমন করে প্রতিদিন অন্ধকার মুছে দিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখায়, তুমিও আমার এই বিধ্বস্ত জীবনে তেমনি এক ফিরে আসা ভোরের আলোর মতো। অন্ধকার কেটে গেছে মনির, তুমি আছো বলেই আমি আবার বাঁচতে শিখছি।"


    ​প্রবাসের সেই নিঃসঙ্গ আর একাকী জীবনে সুমির পাঠানো এই ছোট্ট বার্তাটি মনিরের হৃদয়ে এক অলৌকিক প্রশান্তি এনে দিল। মরুভূমির তপ্ত বালুর ওপর দাঁড়িয়ে তার মনে হলো, সাহেব নগরের সেই পুরনো দিনের সূর্যটা বুঝি আবার তার জীবনের আকাশে নতুন করে উদিত হয়েছে। সব হাহাকার যেন এক নিমিষেই এক পশলা শুদ্ধ বাতাসে পরিণত হলো।

    ৩০। মনের ক্ষত ও এক অসমাপ্ত লড়াইয়ের ভয়

    ​সুমি তার জীবনের দীর্ঘ কয়েক বছরের সব জমানো যন্ত্রণার কথা মনিরের কাছে কান্নায় ভেঙে পড়ে খুলে বলল। সে আজ স্বীকার করল যে, সে আজও মনিরকে আগের মতোই ভালোবাসে, হয়তো বিরহের এই কয়েক বছরে সেই ভালোবাসা আগের চেয়েও অনেক গুণ বেড়ে গেছে। কিন্তু সুমির মনে এক গভীর ক্ষত আর হীনম্মন্যতা তৈরি হয়েছিল। সে মনিরকে উদ্দেশ্য করে কাঁপা গলায় বলল—

    "আমি তো এখন কলঙ্কিত মনির, আমার একবার বিয়ে হয়ে গেছে, বিচ্ছেদ হয়েছে। সমাজ হয়তো আমাকে অন্য চোখে দেখবে। আমি চাইলেও এই নিষ্ঠুর সমাজ আর আমাদের পরিবার হয়তো আমাদের একসাথে থাকতে দেবে না। কিন্তু মনির, আমি আপনাকে ছাড়া অন্য কাউকে কোনোদিন স্বামী হিসেবে ভাবতে পারিনি, আর পারবও না। আপনি কি এই কলঙ্কিত সুমিকে মেনে নেবেন?"


    ​প্রবাসের মরুপ্রান্তরে দাঁড়িয়ে মনিরের মনে হলো, সুমির এই ক্ষত আসলে তার নিজেরই ক্ষত। সুমির এই অসহায়ত্ব তাকে আরও বেশি করে কাছে টেনে নেওয়ার সংকল্প এনে দিল।

    ৩১। আত্মত্যাগ ও এক অদ্ভূত প্রস্তাব

    ​ফোনের ওপাশ থেকে সুমি যখন কথাগুলো বলছিল, মনিরের মনে হলো তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। সুমি কাঁপা কাঁপা গলায় এমন একটি প্রস্তাব দিল যা শুনে মনিরের বুকটা হু হু করে উঠল। সুমি বলেছিল—

    "আমি আপনাকে কোনোদিন জোর করব না মনির যে, আপনি আমাকে সবার সামনে স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দিন। আমি শুধু চাই আপনি আমার স্বামী হোন। আমাকে না হয় লোকচক্ষুর আড়ালে আলাদা একটি বাসায় রাখবেন, আর আমাকে একটি সন্তান (বেবি) দেবেন। আমি সেই সন্তানকে আপনার প্রতিচ্ছবি আর স্মৃতি হিসেবে আগলে রেখে আমার বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেব। আপনি চাইলে আপনার বাবা-মার পছন্দের অন্য কোনো মেয়েকে বিয়ে করে ধুমধাম করে সংসার করবেন, তাতে আমার কোনো আপত্তি থাকবে না। আমি কেবল আপনার জীবনের একটুখানি ভাগ চেয়ে, আপনার নামের সিঁদুরটুকু মনে মনে মেখে বেঁচে থাকতে চাই।"


    ৩২। অশ্রুসিক্ত সম্মতি ও অনন্ত প্রতীক্ষা

    ​সুমির এই নিঃস্বার্থ আর চরম আত্মত্যাগী প্রস্তাব শুনে মনিরের দুচোখ লোনা জলে ভিজে উঠল। প্রবাসের সেই নির্জন ঘরে বসে সে স্তব্ধ হয়ে ভাবছিল—যে মেয়েটি তার জন্য নিজের সম্মান, সামাজিক স্বীকৃতি, এমনকি সারাজীবনের অধিকার বিসর্জন দিতে প্রস্তুত, তার প্রতিদান মনির কীভাবে দেবে? যে মেয়েটি তাকে এতটা নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে পারে, তার জন্য মনিরও দুনিয়ার সব বাধা টপকাতে রাজি হলো। সেদিন মনির মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, সুমিকে সে কক্ষনো আর হারাবে না।

    ​এভাবে বিরহ আর কামনার দোলাচলে কেটে গেল আরও দুটি দীর্ঘ বছর। সুমি ঢাকার সেই ছোট ঘরে কেবল মনিরের ফিরে আসার পথ চেয়ে চাতক পাখির মতো অপেক্ষায় থাকল। প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত যেন ছিল একেকটি যুগের সমান। তবুও সুমির বিশ্বাস ছিল অটল—মনির ফিরবে, আর তাদের এই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটবেই।

    ৩৩। প্রতীক্ষার অবসান ও এক অপার্থিব মিলন

    ​দীর্ঘ কয়েক বছরের প্রবাস জীবনের অবসান ঘটিয়ে মনির যখন অবশেষে নিজের প্রিয় জন্মভূমির মাটিতে পা রাখল, তখন তার মনে হলো দীর্ঘ এক যুগের বনবাস শেষ হলো। কিন্তু সব আকুলতা ছাপিয়ে ছিল সুমির সাথে দেখা করার সেই তীব্র আকাঙ্ক্ষা। অবশেষে যখন সুমির সামনে মনির গিয়ে দাঁড়াল, সেই মুহূর্তটা ছিল একদম অপার্থিব।

    ​অনেকগুলো বছর পর যখন দুই জোড়া চোখ আবার একে অপরের মুখোমুখি হলো, তখন মনে হলো আশেপাশের পৃথিবীটা নিস্তব্ধ হয়ে গেছে, সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। মনির অপলক দৃষ্টিতে সুমিকে দেখে তার নয়ন জুড়িয়ে ফেলল। সেই ছোটবেলার চঞ্চল সুমি আর আজকের এই পরিণত সুমির মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। দীর্ঘ সময়ের বিরহ আর একাকীত্বের ছাপ তার চেহারায় স্পষ্ট, কষ্টের রেখাগুলো যেন তার মুখাবয়বে এক বিষণ্ণ মায়া ছড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু এত কিছুর পরেও সুমির চোখের সেই ভালোবাসার জ্যোতিটা আগের মতোই অটুট আর পবিত্র রয়ে গেছে। সেই এক দৃষ্টিতেই সব হারানো দিনগুলোর হাহাকার এক নিমিষেই মুছে গেল।

    ৩৪। নিঝুম রাতের সাক্ষী ও এক অদেখা আঁধার

    ​পরের দিনই মনির সুমিকে নিচু গলায় বলল, "তোমার সাথে আমার অনেক কথা জমে আছে সুমি। আমি তোমার সাথে একান্তে কিছুক্ষণ কাটাতে চাই।" সুমি কোনো দ্বিধা ছাড়াই সানন্দে রাজি হলো। এক নিঝুম রাতে, যখন পৃথিবীটা ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন সবার অগোচরে মনির আর সুমি দেখা করল। সেই রাতে রূপালী আকাশের চাঁদ সাক্ষী ছিল তাদের দীর্ঘ কয়েক বছরের না বলা পাহাড়সমান কথাগুলোর।

    ​তারা একে অপরের হাত ধরে কতক্ষণ সেই নিস্তব্ধতায় বসে ছিল, তার কোনো হিসেব ছিল না। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সব দুঃখ আর বিরহ বুঝি সেই মুহূর্তের পরম আনন্দের কাছে হার মেনে গেছে। তারা দুজনেই তখন এক নতুন ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন দেখছিল। কিন্তু তারা কি জানত, নিয়তি তাদের জন্য নেপথ্যে আবারও এক চরম অন্ধকার অধ্যায় লিখে রেখেছে?

    ​সুমির সেই অদ্ভুত আত্মত্যাগী প্রস্তাবটি মনিরের হৃদয়ে এক বিশাল পাহাড়ের মতো চেপে বসল। সে ভাবল, যে ভালোবাসা সামাজিক স্বীকৃতির চেয়েও বড় হতে চায়, তার মূল্য কত বিশাল। মনির জানত না এই সম্পর্কের শেষ গন্তব্য কোথায়, কিন্তু সে এটুকু বুঝতে পারছিল—তাদের এই প্রেমের কাহিনী হয়তো সাধারণ দশটা গল্পের মতো পূর্ণতা পাবে না, তবে এর গভীরতা হবে আকাশছোঁয়া এবং অমর।

    ৩৫। প্রাত্যহিক পবিত্রতা ও পুকুর ঘাটের অমলিন স্মৃতি

    ​মনির আর সুমি এখন একে অপরের জন্য এতটাই পাগল যে, তারা একজন আরেকজনকে ছাড়া কিছুই বুঝতে চাইত না। তাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের প্রতিটি কাজ ছিল একে অপরের সান্নিধ্য ঘিরে। মনির যখনই পুকুরে গোসল করতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিত, সে সবার আগে সুমিকে ফোন দিত। সুমিকে ডেকে নিয়ে সে একসাথে পুকুরে গোসল করতে যেত।

    ​সাহেব নগরের সেই পুকুরের স্বচ্ছ নীল জলে তাদের একসাথে গোসল করা আর পানির নিচে লুকোচুরি কিংবা খুনসুটি ছিল প্রতিদিনের এক অসাধারণ আনন্দময় রুটিন। গ্রামের শান্ত প্রকৃতি সাক্ষী ছিল তাদের এই ফিরে পাওয়া শৈশব আর অটুট ভালোবাসার। সেই স্বচ্ছ জল যেন তাদের হৃদয়ের স্বচ্ছতাকেই বারবার মনে করিয়ে দিত।

    ৩৬। অনাকাঙ্ক্ষিত বাধা ও বিলের সেই শান্ত পথ

    ​একদিন সুমি মনিরের কাছে এক আবদার করে বসল। সে বলল, 'চলো না মনির, একটু কোথাও থেকে ঘুরে আসি।' সুমির এই মায়াবী আবদার মনির ফেলতে পারল না। সে সুমিকে নিয়ে গ্রামের একদম নির্জন এক মাঠের দিকে গেল। সেখানে ঘাসের ওপর বসে তারা দুজনে মিলে অনেকটা সময় গল্প করল। দীর্ঘ বিরহের পর এমন একান্তে পাওয়া সময়গুলো ছিল যেন এক টুকরো স্বর্গ।

    ​কিন্তু হঠাৎ করেই সেই নিভৃত আলাপে ছেদ পড়ল। মনিরের মামা ইউনুস সেখানে অপ্রত্যাশিতভাবে চলে আসায় তারা দুজন বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। কথা আর দীর্ঘ না করে মনির আর সুমি দ্রুত সেখান থেকে বিদায় নিল। এরপর তারা দুজনে বিলের মাঝখানের সেই নির্জন ও অপূর্ব সুন্দর রাস্তা দিয়ে ধীরপায়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল। চারদিকে বিলের পানি আর মাঝখানে সরু পথ—তাদের ফেরার মুহূর্তটি ছিল এক অদ্ভুত নীরবতায় ঘেরা।

    ৩৭। বিলের মাঝপথের সেই অপূর্ণ ইচ্ছা

    ​হাঁটতে হাঁটতে তারা যখন বিলের ঠিক মাঝপথে পৌঁছাল, তখন চারপাশজুড়ে গোধূলির শেষ আলোটুকু মিলিয়ে গিয়ে অন্ধকার নেমে এসেছে। চারদিকে জনমানবহীন এক নিস্তব্ধতা, শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক সেই নিস্তব্ধতাকে আরও গভীর করে তুলছিল। এমন নির্জন আর মায়াবী পরিবেশে মনিরের খুব ইচ্ছে করছিল সুমিকে জীবনের প্রথমবারের মতো একবার পরম মমতায় জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু পরক্ষণেই মনিরের মনে সংশয় আর প্রবল দ্বিধা জাগল—সুমি যদি রাগ করে? যদি সে বিষয়টিকে ভুল বোঝে? এই সম্মানের জায়গাটুকু রক্ষা করতে গিয়ে মনির আর কিছুই বলতে বা করতে পারল না।

    ​সুমিও তখন বেশ নার্ভাস অনুভব করছিল; কারণ চারপাশের গাঢ় অন্ধকার আর নির্জনতা তাকে কিছুটা ঘাবড়ে দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তারা দুজনেই সুস্থভাবে বাড়িতে ফিরে এল এবং বাড়ির কেউ টেরও পেল না যে তারা কোথায় গিয়েছিল। তবে সেই সন্ধ্যায় বিলের মাঝখানের সেই ধূসর অন্ধকারে সুমিকে জড়িয়ে ধরার মনিরের সেই সুপ্ত ইচ্ছাটা আজও এক মধুর অথচ অপূর্ণ স্মৃতি হয়ে রয়ে গেল।

            [পঞ্চম অধ্যায় সমাপ্ত]

         অসমাপ্ত এক প্রেমের কাহিনী

    ষষ্ঠ অধ্যায়: মেহেদী রাঙা বিষাদ

    ৩৮। ভাগ্যের নিষ্ঠুর খেলা ও মামার কঠিন প্রস্তাব

    ​মনির আর সুমি যখন নতুন করে বাঁচার আর একসাথে পথ চলার সোনালী স্বপ্ন দেখছিল, ঠিক তখনই ভাগ্যের চাকা যেন নিষ্ঠুরভাবে উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করল। প্রবাসের দীর্ঘ ক্লান্তি শেষে দেশে ফেরার পর, মনিরের অজান্তেই তার পরিবার তাকে নিয়ে সম্পূর্ণ নতুন এক পরিকল্পনা শুরু করে। একদিন হঠাৎ করেই মনিরের মামা ইউনুস তার সামনে এক প্রস্তাব নিয়ে হাজির হলেন, যা মনিরের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।

    ​মামা অত্যন্ত গম্ভীর স্বরে বললেন, “ভাগ্নে, শোন। আমি তোর জন্য একটা খুব ভালো সম্বন্ধ ঠিক করেছি। আমার ভাজতি, অর্থাৎ তোর মামাতো বোন শারমিনকে তুই বিয়ে করবি। মেয়েটা অনেক ভালো, গুণবতী, আর আমাদেরই ঘরের মেয়ে। আমাদের সবার এই বিয়েতেই মত আছে।” মামার এই কথাগুলো মনিরের মাথায় যেন বজ্রপাতের মতো আছড়ে পড়ল।


    ৩৯ (হৃদয়ের বোঝাপড়া (শারমিনের সাথে আলাপ))

    ​কথাটা শুনে মনিরের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। এদিকে আবু সাইয়েদ সাহেবের বাড়ি থেকে যখন খুশির খবর এলো, তখন পুরো বাড়িতে আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। মিষ্টি আনা হলো, আত্মীয়-স্বজনকে জানানো হলো। কিন্তু এই উৎসবের আবহে মনির যেন এক জীবন্ত লাশ। তার কানে তখন বাজছিল সুমির সেই শেষ কথাগুলো, "তুমি আমায় ছেড়ে যাবে না তো?"

    ​মনির তার ঘরের জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরের আকাশটা আজ বড্ড ফ্যাকাসে। সে ভাবছিল, একটা মানুষের জীবন কি শুধুই তার নিজের? নাকি তা কেবল পরিবারের মর্জির ওপর ভাসতে থাকা এক টুকরো খড়কুটো?

    ​মামা ইউনুস ঘরে ঢুকে মনিরের পিঠে হাত রেখে বললেন, "কিরে মনির, মুখটা এমন শুকিয়ে রেখেছিস কেন? দেখবি শারমিন মেয়ে হিসেবে খুব ভালো। তোর সংসার আলো করে থাকবে।"

    ​মনির জোর করে ঠোঁটের কোণে একটু হাসি ফোটানোর চেষ্টা করল, কিন্তু সেই হাসি তার চোখের জলকে আড়াল করতে পারল না। সে মনে মনে ভাবল, "শারমিন হয়তো ভালো মেয়ে, কিন্তু আমার হৃদয়ে যে সিংহাসন পাতা আছে, সেখানে তো অন্য কারো নাম লেখা। সুমিকে দেওয়া সেই কথাগুলোর এখন কী হবে? আমি কি তবে নিজের সুখের বিনিময়ে পরিবারের সম্মান কিনলাম?"

    ​সে রাতে আর মনিরের চোখে ঘুম এলো না। একদিকে বিয়ের সানাইয়ের প্রস্তুতি, অন্যদিকে তার ভালোবাসার বিসর্জন—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে সে কেবল ভোরের অপেক্ষা করতে লাগল। কিন্তু সে জানত, এই ভোর তার জীবনে কোনো আলো নিয়ে আসবে না, বরং এক দীর্ঘ অন্ধকারের সূচনা করবে।

    ৪০. হৃদয়ের বোঝাপড়া

    ​পরিবারের চাপে বিয়ের সানাই বাজতে শুরু করলেও মনিরের ভেতরটা ছটফট করছিল। সে জানত, শারমিনের সাথে কোনো কিছু গোপন রেখে নতুন জীবন শুরু করা কেবল অন্যায় নয়, বরং এক ধরণের প্রতারণা। তাই সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে সে তার মামার বাড়িতে গেল এবং শারমিনের সাথে একান্ত আলাপ করার ইচ্ছা প্রকাশ করল।

    ​শারমিন শান্তভাবে রাজি হলো। দুজনে যখন মুখোমুখি দাঁড়াল, মনির কোনো ভূমিকা না করেই সরাসরি জিজ্ঞেস করল, "শারমিন, তুমি কি জানো আমি আমার চাচাতো বোন সুমিকে ভালোবাসি?"

    ​শারমিন সামান্য ম্লান হেসে উত্তর দিল, "হ্যাঁ মনির ভাই, আমি জানি।"

    ​মনিরের চোখে বিস্ময় খেলে গেল। সে অবাক হয়ে বলল, "সব জেনেও তুমি আমাকে বিয়ে করতে রাজি কেন হলে?"

    ​শারমিন নিচের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থিরভাবে বলল, "আমি জানি আপনি একজন ভালো মানুষ। আর ভালো মানুষের সাথে জীবন কাটানো ভাগ্যের ব্যাপার। তবে আপনার যদি আমাকে একদমই পছন্দ না হয়, তবে আপনি নির্দ্বিধায় বলতে পারেন। আমি নিজে আমার পরিবারকে বলব এই বিয়েটা ভেঙে দেওয়ার জন্য। আপনার ওপর আমি কোনো বোঝা হয়ে থাকতে চাই না।"

    ​শারমিনের এই নিঃস্বার্থ এবং বিশাল মনের পরিচয় পেয়ে মনির স্তব্ধ হয়ে গেল। তার প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধা জন্মাল মনিরের মনে। সে মৃদ স্বরে বলল, "না শারমিন, তার আর দরকার নেই। তুমি নিজেও অনেক বড় মনের মানুষ, তোমার তো কোনো দোষ নেই।"

    ​একটু থেমে মনির আবার বলল, "তবে একটা কথা, বিয়ের পরেও আমি যদি মাঝে মাঝে সুমির সাথে কথা বলি বা তার খবর নেই, তুমি কি কিছু মনে করবে?"

    ​শারমিন মনিরের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, "না, আমি আপনার ভালোবাসাকে সম্মান করি। তবে আমার একটাই মিনতি, তার জন্য আমাকে কষ্ট দিয়েন না।"

    ​মনির পরম মমতায় উত্তর দিল, "না শারমিন, আমি কথা দিচ্ছি, তোমাকে কখনো কষ্ট দেব না।"

    ​এই দৃশ্যটি মনিরের জীবনের এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

    চাচাতো ভাই বোনের প্রেম কাহিনী



    ৪১. বিসর্জনের দীর্ঘশ্বাস

    ​মনিরের বিয়ের চূড়ান্ত খবরটা যখন সুমির কানে পৌঁছাল, তার মনে হলো পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। দীর্ঘ কয়েক বছরের অপেক্ষা, সেই না বলা প্রতিশ্রুতি আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা—সবই যেন এক নিমিষেই ধুলোয় মিশে গেল। সুমির সাজানো বাগানটা আবারও তাসের ঘরের মতো হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল।

    ​সে আকাশপানে চেয়ে রইল, যেখানে কোনো উত্তর নেই। তার সেই আত্মত্যাগ, সেই নির্ঘুম রাতগুলো কি তবে একেবারেই মূল্যহীন হয়ে গেল? কিন্তু সুমি তো সাধারণ কোনো মেয়ে নয়; সে এক অদ্ভুত ধৈর্যশীলা প্রাণ। সে জানত, গ্রাম বাংলার এই কঠোর পারিবারিক কাঠামোর সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করার ক্ষমতা তার নেই।

    ​নিজের বুকফাটা আর্তনাদকে সে গলার কাছে দলা পাকিয়ে চেপে রাখল। বাড়ির সবার সামনে সে স্বাভাবিক থাকার এক চরম অভিনয় শুরু করল। কিন্তু যখনই একা হয়, তার চোখ থেকে অঝোর ধারায় শ্রাবণের বৃষ্টি নেমে আসে। কেউ দেখল না তার সেই নিঃশব্দ কান্না, কেউ জানল না এক বনস্পতির শেকড় উপড়ে ফেলার সেই যন্ত্রণার কথা। সুমি কেবল নীরবে প্রদীপ জ্বালিয়ে অন্ধকারের সাথে সখ্যতা গড়ে নিল।

    ৪২. বিষাদের সানাই

    ​সময় যেন তার নিজ গতিতে বয়ে চলে, কারো অপেক্ষার পরোয়া করে না। দেখতে দেখতে মনিরের গায়ে হলুদের দিন চলে এলো। পুরো সাহেব নগর গ্রাম জুড়ে তখন উৎসবের আমেজ। সবার মুখে হাসি, আনন্দের বন্যা। কিন্তু এই আনন্দঘন পরিবেশের আড়ালে, দুটি মানুষের অন্তরে জ্বলছিল এক নীরব চিতার আগুন।

    ​সুমি সেই দিন তার বাড়িতেই ছিল। তার কান্না কোনো বাঁধ মানছিল না। বালিশে মুখ গুঁজে সে একমনে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছিল। সে জানত, আজকের এই দিনটি তার জীবনের শেষ বসন্তকে বিদায় জানাচ্ছে। আজকের পর মনির আর তার শৈশবের খেলার সাথী থাকবে না, সে চিরদিনের জন্য অন্য কারো হয়ে যাবে। তার দীর্ঘ প্রতীক্ষা, তার না বলা ভালোবাসা—সব যেন আজ ধুলোয় মিশে গেল।

    ​অন্যদিকে, গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে মনিরের হাসি ছিল ফ্যাকাসে, মলিন। সে সবাইকে খুশি রাখার চেষ্টা করছিল, কিন্তু তার ভেতরটা ছটফট করছিল। সেই রাতে, যখন চারপাশ নিস্তব্ধ, মনির যেন সুমির কান্নার শব্দ নিজের হৃদপিণ্ডে অনুভব করতে পারছিল। প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস, প্রতিটি ফোঁপানির শব্দ তাকে ক্ষতবিক্ষত করছিল। কিন্তু সামাজিক দায়বদ্ধতা, পরিবারের সম্মান এবং তার দেওয়া সম্মতি—তাকে এক লোহার শিকলে শক্ত করে বেঁধে ফেলেছে। সে জানত, এই শিকল ভাঙার ক্ষমতা তার নেই। তার নিজের সুখের বিনিময়ে সে আজ অন্য সবার জন্য হাসি কিনছে।

    ৪৩. অশ্রুভেজা মেহেদী

    ​গায়ে হলুদের সেই বিষণ্ণ সন্ধ্যায় মনিরের মাথায় এক অদ্ভুত আর অবুঝ জেদ চেপে বসল। সে জানত, কালকের পর থেকে তার শরীরের প্রতিটি অঙ্গে অন্য একজনের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। তাই সে চাইল, তার জীবনের শেষ পবিত্র স্মৃতিটুকু যেন সুমির হাত দিয়েই রচিত হয়। এক চরম অস্থিরতা নিয়ে মনির সুমিকে নিভৃতে ডেকে পাঠাল। সুমি যখন সামনে এল, মনির তার চোখের দিকে তাকিয়ে ধরা গলায় বলল, “সুমি, আমি চাই আমার বিয়ের প্রথম মেহেদী তুমি নিজের হাতে আমাকে পরিয়ে দাও।”

    ​সুমির কানে শব্দগুলো বিষের মতো লাগল। সে শিউরে উঠে দৃঢ়ভাবে মাথা নেড়ে অস্বীকার করল। যে হাত দিয়ে সে শৈশব থেকে মনিরকে নিজের করে পাওয়ার স্বপ্ন বুনেছে, সেই হাত দিয়ে অন্য কারো সাথে মনিরের মিলনের চিহ্ন সে কীভাবে আঁকবে? সুমির ভেতরটা চুরমার হয়ে যাচ্ছিল। সে কম্পিত কণ্ঠে বলল, “এ তুমি কেমন নিষ্ঠুর দাবি করছ, মনির? আমার পক্ষে এটা সম্ভব নয়।”

    ​কিন্তু মনির ছিল নাছোড়বান্দা। বিচ্ছেদের যন্ত্রণা তাকে এক প্রকার বেপরোয়া করে তুলেছিল। সে সুমির হাত ধরে এক প্রকার টেনে নিয়ে পিঁড়িতে বসাল। তার করুণ এবং আর্তিভরা চোখের দিকে তাকিয়ে সুমি আর ফেরাতে পারল না। মনির মিনতি করে বলল, “আমার জীবনের শেষ এই ইচ্ছেটুকু অন্তত পূর্ণ করো, সুমি।”

    ​অগত্যা, বুকভরা হাহাকার নিয়ে সুমি মেহেদীর বাটি তুলে নিল। তার হাত কাঁপছিল, আঙুলগুলো যেন অবশ হয়ে আসছিল। অতি কষ্টে সে মনিরের প্রসারিত তালুতে মেহেদীর আলপনা আঁকতে শুরু করল। মেহেদীর গাঢ় লাল রঙের প্রতিটি ফোঁটার সাথে সুমির চোখের নোনা জল মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। এক অদ্ভুত দৃশ্য—একপাশে বিয়ের সানাই বাজছে, আর অন্যপাশে ভালোবাসার মানুষটি নিজ হাতে প্রিয়তমকে অন্যের জন্য সাজিয়ে দিচ্ছে।

    ​পুরোটা সময় তাদের মধ্যে কোনো কথা হলো না। বাতাসের দীর্ঘশ্বাস আর সুমির চোখের জলের টুপটুপ শব্দই ছিল সেখানের একমাত্র ভাষা। মেহেদী লাগানো শেষ হলে সুমি এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না; দৌড়ে নিজের ঘরে গিয়ে খিল তুলে দিল।

    ​সেই রাতটা সুমির জীবনে ছিল এক কালরাত। সে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের পাতা এক করতে পারেনি। সারা রাত তার বন্ধ ঘর থেকে কেবল ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ ভেসে আসছিল। সেই কান্নায় ছিল না কোনো অভিযোগ, ছিল কেবল এক হারানো স্বপ্নের জন্য অন্তহীন হাহাকার।

    ৪৪. শেষ আর্তনাদ ও এক নিষ্ঠুর শপথ

    ​বিয়ের ঠিক আগের দিন সন্ধ্যা। চারদিকে উৎসবের আয়োজন চললেও মনিরের আকাশটা ছিল কালো মেঘে ঢাকা। ঠিক সেই মুহূর্তে মনিরের ফোনে সুমির কল এল। ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসা সুমির কণ্ঠস্বরে কোনো কোমলতা ছিল না, ছিল কেবল তীব্র অভিমান আর বুকফাটা কান্নার সুর। সুমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ধরা গলায় বলল, “আপনি যদি আমাকে বিয়েই করবেন না, তবে কেন আমাকে ভালোবাসার জালে জড়িয়েছিলেন? কেন মিথ্যে স্বপ্নের মায়ায় আমাকে আপনার ভালোবাসায় পাগল করেছিলেন? আমি আজ যে কষ্ট পাচ্ছি, তার দায়ভার কি আপনি নেবেন?”

    ​সুমির প্রতিটি শব্দ মনিরের বুকে তীরের মতো বিঁধছিল। সে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, কোনো উত্তর দেওয়ার ভাষা তার জানা ছিল না। কিন্তু সুমি এখানেই থামল না। তার কণ্ঠস্বর হঠাৎ কঠোর আর যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠল। সে শেষবারের মতো এক চূড়ান্ত ঘোষণা দিল, “আজকের পর আপনি আমাকে আর কোনোদিন ফোন দেবেন না। এমনকি আমি যদি মরেও যাই, আপনি আমার লাশ দেখতে আসবেন না আর আমার জানাযাতেও শরিক হবেন না। এটাই আপনার জন্য আমার শেষ কথা।”

    ​সুমির মুখে মরণ আর জানাযার এই নিষ্ঠুর কথাগুলো শুনে মনিরের মনে হলো তার পৃথিবীটা যেন মুহূর্তেই থমকে গেল। তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। বুকভরা হাহাকার আর আর্তনাদ নিয়ে মনির শুধু এতটুকুই বলতে পেরেছিল, “সুমি, দোহাই তোমার, এমন নিষ্ঠুর কথা জীবনে আর কোনোদিন মুখে এনো না। আমি সহ্য করতে পারছি না।”

    ​কিন্তু ফোনের ওপাশে তখন শুধুই নীরবতা। সেই সন্ধ্যার সেই কথোপকথন মনিরের হৃদয়ে এমন এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করল, যা হয়তো সারাজীবনেও শুকাবে না। ভালোবাসার মানুষটি বেঁচে থাকতেই যেন তাদের সম্পর্কের চিরস্থায়ী মৃত্যু ঘটল।

    ৪৫. মেঠো পথের শেষ প্রান্তে

    ​পরদিন সকালে সূর্য উঠল ঠিকই, কিন্তু সেই আলো সাহেব নগর গ্রামের মেঠো পথে কোনো উজ্জ্বলতা নিয়ে এল না। বরং এক নতুন এবং রূঢ় বাস্তবতার জন্ম হলো। সুমি সিদ্ধান্ত নিল, সে আর এই গ্রামে এক মুহূর্তও থাকবে না। যে বাতাসের প্রতিটি ধূলিকণায় মনিরের স্মৃতি মিশে আছে, যেখানে প্রতিদিন মনিরকে অন্য কারো সাথে ঘর করতে দেখতে হবে—সেই নরকযন্ত্রণা সহ্য করার শক্তি তার আর ছিল না।

    ​সুমি আবারও তার তল্পিতল্পা গুছিয়ে নিল। তার ব্যাগে কেবল কিছু কাপড় ছিল না, ছিল একরাশ ভাঙা স্বপ্ন আর দীর্ঘ কয়েক বছরের জমে থাকা হাহাকার। শহরের উদ্দেশ্যে যখন সে রওনা দিল, গ্রামের পরিচিত গাছপালা আর মেঠো পথগুলো যেন তাকে বিদায় জানাচ্ছিল।

    ​যাওয়ার খবর পেয়ে মনির পাগলের মতো ছুটে এসেছিল। সে সুমিকে অনেকবার আটকানোর চেষ্টা করেছিল, কাকুতি-মিনতি করেছিল ফিরে আসার জন্য। কিন্তু সুমি এবার আর ফিরে তাকাল না। তার হৃদয়ের সেই কোমলতা আজ পাথরে পরিণত হয়েছে। সে জানত, একবার পেছনে তাকালে হয়তো সে আর কোনোদিন যেতে পারবে না, অথচ এখানে থাকা মানেই প্রতি মুহূর্তে তিলে তিলে মরে যাওয়া।

    ​সুমি তার ভাঙা মন নিয়ে সাহেব নগর গ্রামের ধুলোমাখা পথ পেছনে ফেলে চলে গেল। মনির নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে চেয়ে রইল সেই পথের দিকে, যে পথে তার জীবনের একমাত্র ধ্রুবতারাটি ধীরে ধীরে দিগন্তের ওপারে হারিয়ে গেল। মনিরের মনে হলো, আজ শুধু সুমি গেল না, তার বেঁচে থাকার শেষ সার্থকতাটুকুও সেই মেঠো পথে হারিয়ে গেল।

                  [ষষ্ঠ অধ্যায় সমাপ্ত]

          অসমাপ্ত এক প্রেমের কাহিনী

    সপ্তম অধ্যায়: জেদের আগুনে পুড়ে যাওয়া স্বপ্ন

    ৪৬। অভিমানে ভরা বিচ্ছেদ ও এক জেদি পরিণয়

    ​সুমি শহর চলে যাওয়ার পর মনিরের জীবনটা যেন এক তপ্ত মরুভূমির মতো হয়ে গেল। একদিকে নতুন বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা, অন্যদিকে বুকের ভেতর সুমিকে হারানোর তীব্র জ্বালা। পুরুষ মানুষের কান্না কেউ দেখতে পায় না, কিন্তু মনিরের ভেতরটা তখন আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলছিল। এই অসহ্য মানসিক অস্থিরতা থেকে মনির একদিন সুমিকে ফোন করল। ফোনে কথা বলার সময় তাদের মধ্যে প্রচণ্ড কথা-কাটাকাটি হলো। অভিমানে আর রাগের মাথায় মনির সুমিকে অত্যন্ত নিষ্ঠুর কিছু কথা বলে বসল। মনির বলেছিল, “তোমাকে কোনোদিন কোনো ছেলে পছন্দ করবে না, তুমি সারাজীবন একলাই থেকে যাবে।”

    ​আসলে মনির এই কথাগুলো বলেছিল সুমির প্রতি তার গভীর ভালোবাসা আর তীব্র অধিকারবোধ থেকে। সে চেয়েছিল সুমি যেন রেগে গিয়ে হলেও তার ওপর একটা দাবি রাখে, কিংবা জিদ করে হলেও নিজের একটা গতি করে নেয়। কিন্তু সুমি এই কথাগুলোকে সরাসরি হৃদয়ে বিঁধিয়ে নিল। তার মনে হলো, যে মানুষের জন্য সে নিজের পুরো জীবনটা উৎসর্গ করতে চেয়েছিল, সেই আজ তাকে এমন অপবাদ দিচ্ছে? সুমির মনে এক ভয়াবহ জেদ চেপে বসল। সে মনে মনে ঠিক করল, সে আজ প্রমাণ করেই ছাড়বে যে তাকেও কেউ ভালোবাসতে পারে।

    ​সেই মুহূর্তেই সুমি লিটন নামের এক প্রবাসীকে ফোন করল। লিটন সিঙ্গাপুরে থাকে এবং সে আগে থেকেই সুমিকে মনে মনে অনেক পছন্দ করত। সুমি ফোনের ওপাশ থেকে কাঁদতে কাঁদতে লিটনকে বলল, “আপনি কি আমাকে বিয়ে করবেন? যদি করেন, তবে আজকের মধ্যেই করতে হবে।”

    ​লিটন থতমত খেয়ে গেল। সে জানত সুমি আর মনিরের সেই অমর প্রেমের কাহিনী। সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেন সুমি? তুমি না মনিরকে ভালোবাসতে? হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত কেন?” সুমি কেবল এক কথাই বলল, “আপনি আমাকে বিয়ে করবেন কি না বলেন? করলে আজই করতে হবে।” লিটন আগে থেকেই সুমিকে ভালোবাসত, তাই সে এই সুযোগ আর হাতছাড়া করতে চাইল না। সে রাজি হয়ে গেল। সেই দিনই মুঠোফোনের ওপাশে কাজি বসিয়ে সুমি আর লিটনের বিয়ে হয়ে গেল।

    ​যখন এই খবর মনিরের কানে পৌঁছাল, তার পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। সে কল্পনাও করতে পারেনি তার বলা কথার পিঠে সুমি এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নেবে। মনিরের বুকটা হু হু করে কেঁদে উঠল—কারণ সে জানত, সুমি কেবল জেদের বশে এই কাজ করেছে। এখন অন্য একজন পুরুষ সুমির হাতে হাত রাখবে, তার ওপর অধিকার ফলাবে—এই চিন্তাটা মনিরকে কুরে কুরে খেতে লাগল। কিন্তু পরক্ষণেই মনির নিজেকে সান্ত্বনা দিল এই ভেবে যে, অন্তত সুমি একটা আশ্রয় তো পেয়েছে। সে ঘর-সংসার করে সুখে থাকবে, এটাই হয়তো বিধাতার লিখন ছিল।

    ৪৭। দুটি সমান্তরাল পথ ও এক অসমাপ্ত উপাখ্যান

    ​এভাবেই দুটি জীবন দুটি আলাদা সমান্তরাল পথে চলতে শুরু করল। মনিরের জীবনে স্ত্রী হিসেবে এলো শারমিন, আর সুমির জীবনে স্বামী হিসেবে এলো লিটন। সাহেব নগরের সেই দুই চাচাতো ভাই-বোনের অমর প্রেম যেন এক গভীর দীর্ঘশ্বাসের আড়ালে চিরতরে ঢাকা পড়ে গেল। সময়ের প্রবল স্রোতে তারা একে অপরের থেকে যোজন যোজন দূরে সরে গেল ঠিকই, কিন্তু হৃদয়ের গহীনে সেই পুরনো ক্ষতটা আজও এক অব্যক্ত যন্ত্রণার মতো রয়ে গিয়েছে।

    ​তারা দুজনেই আজ সংসারী, নিজেদের ঘর-সংসার আর দায়িত্ব নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু জীবনের কোনো এক নিভৃতক্ষণে যখন তারা পেছনে ফিরে তাকায়, তখন সেই পুরনো প্রেমটা তাদের কাছে ধরা দেয় এক ‘অসমাপ্ত কাহিনী’ হয়ে। যে গল্পের শুরুটা ছিল রঙিন, কিন্তু শেষটা হলো এক বিষণ্ণ নীরবতায়।

               [সপ্তম অধ্যায় সমাপ্ত]

         অসমাপ্ত এক প্রেমের কাহিনী

    অষ্টম অধ্যায়: দশ বছরের ব্যবধান ও একটি শোকাতুর বিচ্ছেদ

    ৪৮। সময়ের স্রোতে বদলে যাওয়া জীবন

    ​সময় কারো জন্য থেমে থাকে না; প্রবহমান নদীর মতোই সে বয়ে চলে আপন গতিতে। সাহেব নগরের মেঠো পথ দিয়ে অনেক ঋতু গত হয়েছে, অনেক স্মৃতি ধুলোয় মিশেছে। দেখতে দেখতে মনির আর সুমির জীবনের ক্যালেন্ডার থেকে দশটি দীর্ঘ বছর ঝরে গেল। এই দশ বছরে তাদের জীবন আর অবস্থান আমূল বদলে গেছে। মনির এখন সংসারী, দায়িত্ববান এক বাবা। তার ঘর আলো করে এসেছে দুই সন্তান—মেয়ে খাদিজা আর ছেলে ওসমান

    ​অন্যদিকে, সুমির সংসারেও সময়ের ছাপ স্পষ্ট। সে এখন তিন সন্তানের জননী। তার কোল জুড়ে এসেছে ইরফাত, বাইজিদ এবং সবার ছোট আদরের মেয়ে লামহা। তারা দুজনেই এখন নিজেদের সন্তানদের পৃথিবীতে ব্যস্ত, তবুও হৃদয়ের কোনো এক কোণে আজও সেই পুরনো দিনের প্রতিধ্বনি শোনা যায়।

    ​৪৯। বাইজিদ: এক অদ্ভুত মায়ার বন্ধন

    ​মনির তার নিজের সংসার আর সন্তানদের নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও, সুমির প্রতি তার সেই পুরনো টান কখনো মুছে যায়নি। বরং সেই টান এক নতুন রূপ নিল সুমির মেজো ছেলে বাইজিদকে দেখে। তিন বছর বয়সী বাইজিদের সাথে মনিরের তৈরি হলো এক অদ্ভুত মায়ার বন্ধন। ছোট বাইজিদকে যখনই মনির দেখত, তার মনে হতো এ যেন সুমির সেই চঞ্চল শৈশবেরই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

    ​বাইজিদের চঞ্চলতা আর নিষ্পাপ হাসি মনিরের বিষণ্ণ মনে আনন্দের জোয়ার নিয়ে আসত। মনির মনে মনে এক গভীর বাসনা লালন করতে শুরু করল—এই ছেলেটিকে সে নিজের কাছে নিয়ে আসবে, নিজের সন্তানের মতো করে বড় করবে। সুমিকে না পাওয়ার সেই অপূর্ণতা যেন সে বাইজিদের মধ্য দিয়েই পূর্ণ করতে চাইছিল। ভালোবাসার মানুষটিকে না পেলেও, তার অংশকে আগলে রাখার এই আকুতিই ছিল মনিরের বেঁচে থাকার এক নতুন রসদ।

    ৫০। নিয়তির নিষ্ঠুর খেলা ও বাইজিদের চিরবিদায়

    ​কিন্তু নিয়তি বড় নিষ্ঠুর। বিধাতা মানুষকে যেমন দুহাত ভরে দেন, তেমনি কেড়ে নিতেও দ্বিধা করেন না। একদিন হঠাৎ করেই সাহেব নগর গ্রামে এক গভীর শোকের ছায়া নেমে এল। লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ল এক বীভৎস খবর—সুমির কলিজার টুকরো, সেই চঞ্চল ছোট্ট বাইজিদ বাড়ির পাশের পুকুরের পানিতে ডুবে মারা গেছে।

    ​খবরটি যখন মনিরের কানে পৌঁছাল, তার মনে হলো বুকের ভেতর থেকে কলিজাটা কেউ টেনে ছিঁড়ে ফেলেছে। যে নিষ্পাপ শিশুটিকে সে নিজের করে পেতে চেয়েছিল, নিজের সন্তানের মতো আগলে রাখতে চেয়েছিল, সে আজ সব মায়ার বাঁধন ছিঁড়ে চিরদিনের জন্য না ফেরার দেশে চলে গেল। মনিরের দীর্ঘদিনের লালিত সেই শেষ স্বপ্নটুকুও এক মুহূর্তের নিঃশব্দে ধূলিসাৎ হয়ে গেল।

    ​৫১। সুমির হাহাকার ও এক অপূরণীয় শূন্যতা

    ​সুমি তখন পাগলের মতো হয়ে গেছে। নিজের নাড়িছেঁড়া সন্তানের নিথর দেহ দেখে তার বুকফাটা আর্তনাদে সাহেব নগরের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠল। মায়ের সেই গগনবিদারী চিৎকার যেন পাথরের বুকও চিরে ফেলে। মনির দূর থেকে দাঁড়িয়ে সুমির সেই হাহাকার দেখছিল আর নিরবে নিজের চোখের জল মুছছিল। বাইজিদের সেই মায়াবী মুখটা, তার সেই আধো-আধো বুলি বারবার মনিরের চোখের সামনে ভেসে উঠছিল তারপর ভাইজিদের লাশকে কাফনে মরিয়া মনের যখন দুই হাতের উপরে রেখে কবরস্থানের দিক যাচ্ছিল তখন মনের দেখতে পেল বাজিতার শরীরটা অনেক ভারী হয়ে গেল তারপর দাফন করে চলে আসলো ।

    ​অসহায় মনির মনের গভীর থেকে কেবল একটি দোয়াই করছিল— "হে আল্লাহ, এই নিষ্পাপ শিশুটিকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করো।" বাইজিদের এই অকাল মৃত্যু যেন মনির আর সুমির সেই পুরনো ক্ষতে নতুন করে বিষাক্ত নুন ছিটিয়ে দিল। এক বিশাল অপূরণীয় শূন্যতা আর স্তব্ধতা গ্রাস করল দুই পরিবারকে, যা হয়তো কোনোদিনও পূরণ হবার নয়।

                 [অষ্টম অধ্যায় সমাপ্ত]

          অসমাপ্ত এক প্রেমের কাহিনী

    নবম অধ্যায়: স্মৃতির জানালায় দাঁড়িয়ে (উপসংহার)

    ৫২। শান্ত মোহনা ও পরিণত এক অনুভূতি

    ​বাইজিদের চলে যাওয়াটা যেন জীবনের এক চরম ও কঠিন সত্যকে আমাদের সবার সামনে দাঁড় করিয়ে দিল। শোকাতুর দিনগুলো একে একে পার হয়ে পৃথিবী যখন আবার তার চেনা ছন্দে ফিরতে শুরু করল, মনির আর সুমি লক্ষ্য করল—জীবনের অনেক চড়াই-উতরাই, ঝড় আর ঝাপটা পেরিয়ে তারা এখন এক শান্ত মোহনায় এসে দাঁড়িয়েছে। জীবনের সেই উত্তাল সময়গুলো আজ অনেক দূরে পড়ে আছে।

    ​যৌবনের সেই পাগলামি মেশানো উত্তাল প্রেম, বিরহের সেই বুকফাটানো হাহাকার আর বিচ্ছেদের সময়কার সেই অন্ধ জেদ—সবকিছু এখন সময়ের প্রলেপে পরিণত হয়েছে এক গভীর শ্রদ্ধাবোধে। তারা আজ বুঝতে পেরেছে, জীবন মানে কেবল না পাওয়াকে নিয়ে হাহাকার করা নয়, বরং যা আছে তাকে সম্মান করা এবং জীবনের প্রতিটি বাঁককে মেনে নেওয়া। একে অপরের প্রতি সেই পুরনো প্রেমটা এখন আর কেবল ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা এক পবিত্র এবং শান্ত অনুভূতির নাম হয়ে রয়ে গেছে।

    ৫৩। এক পবিত্র গন্তব্য ও হৃদয়ের প্রশান্তি

    ​বর্তমানে মনির তার স্ত্রী শারমিন এবং দুই সন্তান—খাদিজা ও ওসমানকে নিয়ে এক সাজানো-গোছানো সুখী সংসার করছে। অন্যদিকে সুমিও তার স্বামী আর বাকি দুই সন্তানকে নিয়ে নিজের ঘর সামলাচ্ছে পরম যত্নে। দীর্ঘ বছরের ধুলোবালি আর জীবনের বাস্তবমুখী লড়াই তাদের দুজনের শরীর থেকে যৌবনের সেই চঞ্চলতা কেড়ে নিলেও, হৃদয়ের গহীনে সেই পুরনো সাহেব নগরের মনির আর সুমি আজও অমলিন হয়ে বেঁচে আছে।

    ​এখন মাঝে মাঝে তাদের মধ্যে কথা হয়। তবে সেই কথাগুলোতে এখন আর কোনো জাগতিক দাবি নেই, নেই কোনো পাওয়ার হাহাকার কিংবা না পাওয়ার আক্ষেপ। বরং সেখানে মিশে আছে একে অপরের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা এবং একরাশ নিঃস্বার্থ শুভকামনা। তারা যখন পুরনো দিনের সেই ৫ বছর বয়সের ধূসর স্মৃতি, একসাথে ধুলোবালিতে খেলাধুলা করা কিংবা সেই কিশোরী বয়সের অজান প্রেমে পড়ার গল্পগুলো নিয়ে আলাপ করে, তখন তাদের মনের সব পুরনো ক্ষত আর কষ্ট যেন নিমেষেই উধাও হয়ে যায়।

    ​তাদের এই বর্তমান যোগাযোগ এখন আর সমাজের চোখে কোনো অপরাধ নয়, বরং এটি হলো দুটি পরিপক্ব আত্মার এক গোপন প্রশান্তি। যে সম্পর্কের শুরু হয়েছিল শৈশবের পবিত্রতায়, আজ তা জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এক শান্ত ও শ্রদ্ধাশীল মোহনায় গন্তব্য খুঁজে পেয়েছে।

    অসমাপ্ত রয়ে গেছে তাদের প্রেমের কাহিনী, কিন্তু পূর্ণতা পেয়েছে তাদের সম্মান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা। মনির আজ বুঝতে পারে, সুমিকে সে তার পুরো জীবনে কখনো ভুলতে পারবে না। সুমিও জানে, মনিরের জন্য তার হৃদয়ে যে জায়গাটি আছে, সেখানে অন্য কেউ কোনোদিন পৌঁছাতে পারবে না। তাদের এই প্রেম হয়তো এই দুনিয়ার সাধারণ সংজ্ঞায় কোনো নাম পায়নি, কিন্তু পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলার কাছে তারা কেবল এটুকুই প্রার্থনা করে—যদি ইহকালে সম্ভব না হয়, তবে পরকালের কোনো এক শান্ত নিকেতনে যেন তাদের এই ভালোবাসা পূর্ণতা পায়।

    ৫৪। পরকালের প্রতীক্ষা ও ভালোবাসার চূড়ান্ত গন্তব্য

    ​তাদের প্রেমের কাহিনী হয়তো পৃথিবীর নিয়মে অসমাপ্ত রয়ে গেছে, কিন্তু এক অভাবনীয় পূর্ণতা পেয়েছে তাদের পারস্পরিক সম্মান ও অটুট শ্রদ্ধায়। মনির আজ জীবনের এই প্রান্তে এসে স্পষ্ট বুঝতে পারে, সুমিকে সে তার পুরো জীবনে কখনো ভুলতে পারবে না—সুমি তার অস্তিত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। অন্যদিকে সুমিও জানে, মনিরের জন্য তার হৃদয়ের গহীনে যে বিশেষ স্থানটি সংরক্ষিত আছে, সেখানে অন্য কেউ কোনোদিন পৌঁছাতে পারবে না।

    ​তাদের এই প্রেম হয়তো এই দুনিয়ার সাধারণ সংজ্ঞায় কোনো নাম পায়নি, কোনো সামাজিক স্বীকৃতিতে বাধা পড়েনি। কিন্তু পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলার কাছে তারা আজ কেবল এটুকুই প্রার্থনা করে—এই নশ্বর পৃথিবীর সীমাবদ্ধতায় যা সম্ভব হয়নি, পরকালের কোনো এক শান্ত নিকেতনে যেন তাদের সেই পবিত্র ভালোবাসা পূর্ণতা পায়। যেখানে থাকবে না কোনো বিচ্ছেদের ভয়, থাকবে না কোনো সামাজিক বাধা; কেবল থাকবে চিরন্তন শান্তি আর এক অসীম ভালোবাসার গল্প।

                    [বইটির সমাপ্তি]

    শেষ কথা:

    পাঠকদের উদ্দেশ্যে একরাশ অনুভূতি

    প্রিয় পাঠক,

    ​এতক্ষণ আপনারা যে কাহিনীটি পড়লেন, এটি কেবল একটি গল্প নয়—এটি দুটি হৃদয়ের ৫৪টি অধ্যায়ের এক দীর্ঘ পথচলা। আমাদের সমাজে আমরা প্রায়ই মনে করি, প্রেম মানেই বুঝি দিনশেষে এক ছাদের নিচে থাকা কিংবা সামাজিক স্বীকৃতি। কিন্তু মনির আর সুমির এই জীবনকাব্য আমাদের শেখায় যে, ভালোবাসার অন্য এক নাম হলো ‘ত্যাগ’ এবং ‘শ্রদ্ধা’।

    ​জীবন সবসময় আমাদের পরিকল্পনা মতো চলে না। কখনো পারিবারিক দায়িত্ব, কখনো সামাজিক কাঠামো, আবার কখনো নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস আমাদের প্রিয় মানুষটির থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। কিন্তু সেই দূরে সরে যাওয়া মানেই কি সব শেষ হয়ে যাওয়া? না। মনির আর সুমি প্রমাণ করে দিয়েছে যে, একে অপরের থেকে যোজন যোজন দূরে থেকেও, অন্য কারো সাথে সংসার করেও হৃদয়ের পবিত্রতা বজায় রাখা সম্ভব।

    ​এই গল্প থেকে আমাদের জন্য কিছু ছোট শিক্ষা রয়ে যায়:

    • সম্মানই শেষ কথা: বিচ্ছেদ মানেই একে অপরের প্রতি কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি নয়। বিচ্ছেদের পরেও একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা রাখাটাই হলো প্রকৃত মনুষ্যত্ব।
    • অভিমান ও জেদ: রাগের মাথায় নেওয়া একটি ছোট সিদ্ধান্ত বা একটি নিষ্ঠুর কথা কীভাবে দুটি জীবনকে আজীবনের জন্য বদলে দিতে পারে, তা আমরা সুমির সিদ্ধান্তে দেখেছি। তাই আবেগের মুহূর্তে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা কতটা জরুরি, তা এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়।
    • পরকালের প্রত্যাশা: এই দুনিয়ায় সব চাওয়া পূর্ণ হয় না। কিছু গল্প অসমাপ্ত থাকাই সুন্দর, কারণ সেই অপূর্ণতাই আমাদের কোনো এক অসীম পূর্ণতার দিকে নিয়ে যায়।

    ​পরিশেষে এটুকুই বলব, আপনাদের জীবনেও যদি এমন কোনো ‘অসমাপ্ত কাহিনী’ থাকে, তবে তাকে ঘৃণা দিয়ে নয়, বরং সুন্দর স্মৃতি আর শুভকামনা দিয়ে আগলে রাখুন। দিনশেষে আমরা সবাই তো একমুঠো স্মৃতি নিয়েই বেঁচে থাকি।

    আপনাদের সবার জন্য রইল নিরন্তর শুভকামনা।

    ফ্রি-তে এই বইটি ডাওনলোড করতে ডাওনলোডে ক্লিক করুন 




    লেখক এম এস মনির খান

    সমাপ্তি 


    0 Comments

    Post a Comment

    Post a Comment (0)

    Previous Post Next Post