খাসি কুরবানি করা জায়েজ ও উত্তম: হাদিস ও ফিকহের আলোকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত দলিল
নাহমাদুহু ওয়া নুসল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম -আম্মা বা’দ।
পবিত্র জিলহজ মাস এবং ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসলেই আমাদের সমাজে কুরবানির পশু নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা ও মাসআলা-মাসায়েল সামনে আসে। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— খাসি (খাসিকৃত ছাগল বা ভেড়া) কুরবানি করা যাবে কি না, কিংবা এটি করা কতটা উত্তম? আমাদের সমাজে অনেকের মধ্যে এই নিয়ে স্পষ্ট ধারণার অভাব রয়েছে। আজকে আমরা পবিত্র হাদিস শরিফ এবং হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য ইমামদের বক্তব্যের আলোকে বিস্তারিত জানব যে, খাসি কুরবানি করা কেবল জায়েজই নয়, বরং অত্যন্ত উত্তম একটি ইবাদত।
১. হাদিস শরিফের আলোকে খাসি কুরবানি
ছয় জন সাহাবি থেকে বর্ণিত হাদিস শরিফ দ্বারা জানা যায়, আমাদের প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে খাসি দিয়ে কুরবানি করেছেন। নিচে এর প্রধান দলিলগুলো আরবী ইবারত ও রেফারেন্সসহ তুলে ধরা হলো:
হাদিস নম্বর ১: হযরত আবু রাফে (রাদ্বি.)-এর বর্ণনা
ইমাম আহমাদ, ইমাম আবু বকর বায়হাক্বী, ইমাম ইবনু আবি শায়বাহ রহ.সহ অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন—
حَدَّثَنَا حُسَيْنُ حَدَّثَنَا شَرِيكَ عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مُحَمَّدٍ عَنْ عَلَى بْنِ حُسَيْنٍ عَنْ أَبِي رَافِعٍ قَالَ: ضَحى رَسُولُ اللهِ بِكَبْشَيْنِ أَمْلَحَيْنِ مَوْجِيَّيْنِ خَصِيَّيْنِ
অনুবাদ: "হজরত আবু রাফে রাদ্বি. হতে বর্ণিত তিনি বলেন: আল্লাহর রাসুল দুটি মোটাতাজা খাসিকৃত বকরা কুরবানি করেছেন।"
(সূত্র: মুসনাদু আহমাদ, হা/২৩৮৬০; বায়হাক্বী: আস-সুনানুল কুবরা, ৯/৪৯৫; মুছান্নাফু ইবনে আবি শায়বাহ, হা/৪১; হায়ছামী: মাজماউয জাওয়াইদ, ৪/১৮, হা/৫৯৬৬;友情 হাফিজ ইবনু কাসির: জামেউল মাসানিদ ওয়াস সুনান, হা/১১৮৫৭)
হাদিস নম্বর ২: হযরত আয়েশা ও আবু হুরায়রা (রাদ্বি.)-এর বর্ণনা
ইмам আহমাদ, ইমাম হাকেম, ইমাম ইবনু মাজাহ কাযবিনী, ইমাম বায়হাক্বী, ইমাম আবু জাফর তাহাবী রহ.সহ অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন—
حَدَّثَنَا وَكِيعٌ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مُحَمَّدِ بْنِ عَقِيلٍ عَنْ أَبِي سَلَمَةَ عَنْ عَائِشَةَ أَوْ أَبِي هُرَيْرَةَ: أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى بِكَبْشَيْنِ سَمِينَيْنِ عَظِيمَيْنِ أَمْلَحَيْنِ أَقْرَنَيْنِ مُوْجَيين.
অনুবাদ: "হজরত আয়েশা রাদ্বি, অথবা আবু হুরায়রা রাদ্বি, বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসুল কুরবানির ইচ্ছা করলেই দুটি মোটাতাজা, শিংযুক্ত, ধূসর বর্ণের, খাসিকৃত বকরা ক্রয় করতেন। অতঃপর এর একটি আপন উম্মতের জন্য যারা আল্লাহর তাওহীদ ও নুবুয়্যাতের প্রচারের সাক্ষী দেয়, তাদের পক্ষ থেকে এবং অপরটি হজরত মোহাম্মাদ ও তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানি করতেন।"
(সূত্র: মুসনাদে আহমাদ, হা/২৫০৪৬; হাকেম: আল-মুস্তাদরাক, হা/২৬৯২; সুনানু ইবনে মাজাহ, ২৩২ পৃ, হা/৩১২২; তাহাবী শরিফ, হা/৬২২৪; বায়হাক্বী: আস-সুনানুল কুবরা, ৯/৪৯৫, হা/১৯০৪৭)
হাদিস নম্বর ৩: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আদরা (রাদ্বি.)-এর বর্ণনা
ইমাম আবু নুয়াইম ইস্পাহানী রহ. বর্ণনা করেছেন—
حَدَّثَنَا جَعْفَرُ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ عَمْرِو ثنا أَبُو حُصَيْنٍ مُحَمَّদُ بْنُ الْحُصَيْنِ ثنا يَحْيَى بْنُ عَبْدِ الْحَمِيدِ الْحِمَانِي ثنا ابْنُ الْمُبَارَكِ عَنْ يَحْيَى بْنِ عَبْدِ اللهِ قَالَ: سَمِعْتُ أَبِي يَقُولُ: ضَلَّى رَسُولُ اللهِ بِكَبْشَيْنِ أَمْلَحَيْنِ مَوْجُوعَيْنِ
অনুবাদ: "ইয়াহইয়া ইবনে আব্দুল্লাহ বলেন, আমি আমার পিতা বায়াতে রিদ্বওয়ানের সাহাবি হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আদরা রাদ্বি-কে বলতে শোনেছি তিনি বলেছেন: আল্লাহর রাসুল দুইটি মোটাতাজা খাসিকৃত কবস বা মেষ কুরবানি করেছেন।" (সূত্র: আবু নুয়াইম: হিলিয়াতুল আউলিয়া, ৮/১৭৬)
অন্যান্য সাহাবিদের বর্ণনা:
অনুরূপভাবে হজরত জাবের রাদ্বি., হজরত আবু দারদা রাদ্বি. ও হজরত বিলাল রাদ্বি. থেকেও এই মর্মে বিশুদ্ধ হাদিস বর্ণিত রয়েছে।
২. মুহাদ্দিসগণের দৃষ্টিতে হাদিসগুলোর নির্ভরযোগ্যতা
এই হাদিসগুলোকে ইসলামের ইতিহাসের বিখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিস এবং হাফেজগণ "হাসান ছহীহ্" (উন্নত ও বিশুদ্ধ) বলেছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন:
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.)
- ইমাম হাকেম (রহ.)
- ইমাম আবুল হাসান মুরগিনানি (রহ.)
- হাফিজ ইবনু হাজার আসকালানী (রহ.)
- হাফিজ ইবনু মুলাক্কিন (রহ.)
- হাফিজ নুরুদ্দিন হায়ছামী (রহ.)
- হাফিজ শিহাব উদ্দিন কেনানী (রহ.)
- ইমাম শিহাব উদ্দিন কাস্তালানী (রহ.)
- ইমাম ফখরুদ্দিন যায়লায়ী (রহ.)
- আল্লামা শুয়াইব আরনাউত (রহ.)
৩. ফিকহে হানাফির আলোকে খাসি কুরবানির বিধান
হানাফি মাযহাবের আদি এবং শীর্ষস্থানীয় ফকিহদের ফতোয়া অনুযায়ী খাসি কুরবানি করা পুরোপুরি বৈধ এবং অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
ইমাম মোহাম্মাদ ইবনু হাসান আশ শায়বানী রহ. (ওফাত ১৮৯ হি.)-এর মত:
ছাহিবু জাহিরির রেওয়ায়েত, মুজতাহিদ ফিল মাযহাব, ইমামে আযম আবু হানিফা রাদ্বি. এর প্রধান ছাত্র ইমাম মোহাম্মাদ বলেন:
الْخصي مِنَ الأُضْحِيَةِ يُجْزِئُ مِمَّا يُجْزِئُ مِنْهُ الْفَحْلُ
অনুবাদ: "কুরবানির বেলায় পাঠা যেমনি জায়েজ তেমনি খাসি কুরবানিও জায়েজ।" (সূত্র: মুয়াওত্তা মোহাম্মাদ, ২৮০ পৃ.)
ইমাম হাসান ইবনু মানসুর কাজিখান রহ. (ওফাত ৫৯২ হি.)-এর ফতোয়া:
হানাফি মাযহাবের তৃতীয় তাবকার বিখ্যাত ফকিহ্ তাঁর বিখ্যাত কিতাব 'ফাতাওয়ায়ে কাজিখাঁন'-এ উল্লেখ করেছেন:
وَالْأُنْثَى مِنَ الْإِبِلِ وَالْبَقَرِ أَفْضَلُ مِنَ الذَّكَرِ وَالْمَعْزِ أَفْضَلُ وَكَذَا الذَّكَرُ مِنَ الضَّأْنِ إِذَا كَانَ مَوْجُوعًا أَيْ خَصِيًّا.
অনুবাদ: "কুরবানির বেলায় পাঠা থেকে গাভী ও উষ্ট্রী উত্তম এবং পাঠা, গাভী ও উষ্ট্রী থেকে খাসি কুরবানি আরো উত্তম।" (সূত্র: ফাতাওয়া কাজিখাঁন, ৪/৩৩১)
এছাড়াও হানাফি মাযহাবের বহুসংখ্যক মুজতাহিদ ফকিহ স্পষ্ট ভাষায় খাসি কুরবানি করাকে শুধু জায়েজই বলেননি, বরং পশুর গোশত সুস্বাদু ও চমৎকার হওয়ার কারণে এটিকে অন্যতম উত্তম মাধ্যম বলেছেন।
(বিশেষ ঘোষণা: এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত ও তাত্ত্বিক আলোচনা নিয়ে আমার লিখিত কিতাব খুব দ্রুতই বাজারে আসছে ইনশাআল্লাহ।)
উপসংহার
উপরের আলোচনা থেকে দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, খাসি কুরবানি করার সপক্ষে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ এবং আমল রয়েছে। খাসি করার কারণে পশুর শারীরিক ত্রুটি হয় না, বরং গোশতের মান ও স্বাদ বৃদ্ধি পায়—যা কুরবানির মূল উদ্দেশ্যকে (মানুষকে ভালো গোশত খাওয়ানো) আরও সুন্দরভাবে পূরণ করে। তাই কোনো প্রকার দ্বিধাদ্বন্দ্ব না রেখে সুন্নতের অনুসরণে খাসি কুরবানি করা উত্তম।
আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে সহীহ সুন্নাহ ও ফিকহের আলোকে সঠিক নিয়মে কুরবানি করার তৌফিক দান করুন। আমীন, সুм্মা আমীন।

Post a Comment