বিদায় হজের ভাষণে নবীজি ﷺ যা বলেছিলেন: বিশ্বমানবতার মুক্তির সনদ
নাহমাদুহু ওয়া নুসল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম -আম্মা বা’দ।
পবিত্র কোরআনের ঘোষণা অনুযায়ী:
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَরَضِيتُ لَكُمُ الإِسْلاَمَ دِينًا
"আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।" (সূরা মায়েদাহ, আয়াত: ৩)
এই ভাষণে হাজার হাজার সাহাবা উপস্থিত ছিলেন আরাফার ময়দানে। এই আয়াত নাযিলের পর সমস্ত সাহাবীরা যখন খুশিতে আনন্দিত, ঠিক তখনি আফজালুন্নাস্ বাদাল আম্বিয়া হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিআল্লাহু আনহু অশ্রুসজল চোখে বল্লেন, "এই আয়াত যে বিদায়ের আয়াত – আজ আমি বিদায়ের গন্ধ পাচ্ছি; ইসলাম পরিপূর্ণ করার মানে প্রিয় নবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কাজের জন্য এসেছিলেন, তা সমাপ্ত হয়েছে; আর তা সমাপ্ত করার মানে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন।"
হজ্বের ঐতিহাসিক পটভূমি
দশম হিজরির জিলহজ মাসে আল্লাহর রাসূল প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সঙ্গী-সাথীসহ হজ্বের উদ্দেশ্যে মক্কা নগরীতে গমন করেন এবং হজ্ব সম্পাদন করেন। এই ভাষণে ইসলামের প্রকৃত মূল্যবোধ অনুযায়ী মুসলমানদের করণীয় সম্পর্কে চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা ছিলো। দীর্ঘ ২৩ বছর কঠিন পরিশ্রম, সংগ্রাম, অপরিসীম কুরবানি ও ত্যাগ স্বীকার করে আজ তা পূর্ণতায় উপনীত। ইসলামের ইতিহাসে তা-ই ‘হাজ্জাতুল বিদা’ বা ‘বিদায় হজ’ নামে পরিচিত। এ ছাড়া এই ভাষণকে ‘হাজ্জাতুল বালাগ’ ও ‘হাজ্জাতুত তামাম’ বা পূর্ণতার হজ নামেও অভিহিত করা হয়।
আরাফাতের ময়দানে ৯ জিলহজ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে আল্লাহ্ তা’আলার প্রশংসা করার পর তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ পেশ করলেন।
বিদায় হজের ভাষণের মূল দিকনির্দেশনা
- মনোযোগ ও গুরুত্ব: "হে মুসলিম উম্মাহ, আমার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনো। আমার মনে হচ্ছে এর পরে হজ্বে যোগ দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠবে না।"
- পথচলার পাথেয়: "আমি তোমদের কাছে দু’টি বিষয় রেখে যাচ্ছি, তা দৃঢ়তার সাথে ধরে রাখলে তোমরা সামান্যও পথভ্রষ্ট হবে না। তা হচ্ছে كِتَابَ اللهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ আল্লাহর কিতাব (আল-কুরআন) ও তাঁর রাসূলের সুন্নাত (হাদীস/আদর্শ)।" (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
- কুসংস্কার বর্জন: "মূর্খ যুগের সমস্ত কুসংস্কার, সমস্ত অন্ধ বিশ্বাস এবং সকল প্রকারের অনাচার আজ মথিত হয়ে গেল।" (সহীহ বুখারী)
- ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা: "একজনের অপরাধের জন্যে অন্যকে দণ্ড দেয়া যাবে না। অতএব, পিতার অপরাধের কারণে সন্তান, আর সন্তানের অপরাধের কারণে পিতাকে দায়ী করা চলবে না।" (তিরমিযী)
- রক্ত ও সুদের দাবি রহিত: "সমস্ত রক্ত-প্রতিশোধ আজ থেকে রহিত। আমি সর্বপ্রথম ঘোষণা করছি, আমার গোত্রের প্রাপ্য সকল সুদ ও সকল প্রকার রক্তের দাবি আজ থেকে রহিত হয়ে গেল।" (সহীহ মুসলিম)
- জবাবদিহিতা: "মনে রেখো, তোমাদের সবাইকেই আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হবে। তাঁর কাছে সকল বিষয়ে জবাবদিহি করতে হবে। সাবধান! তোমরা যেন আমার পরে ধর্মভ্রষ্ট হয়ে না যাও।"
- জান-মালের পবিত্রতা: "প্রত্যেক মুসলমানের ধন সম্পদ, মান-সম্ভ্রম এবং প্রত্যেক মুসলমানের রক্তবিন্দু তেমনি তোমাদের কাছে মহান, তেমনি পবিত্র। কোনো মুসলমানের সম্পত্তি, সম্মান ও প্রাণের ক্ষতি করা তোমাদের জন্যে হারাম।" (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
- শয়তানের চক্রান্ত থেকে সাবধান: "শয়তান নিরাশ হয়েছে, সে আর কখনো তোমাদের কাছে পাত্তা পাবে না। কিন্তু সাবধান! অনেক বিষয়কে তোমরা ক্ষুদ্র বলে মনে করো, অথচ শয়তান সে বিষয় দিয়েই তোমাদের সর্বনাশ করে থাকে।" (ইবনে মাজাহ)
- নারীদের অধিকার: "নারীদের ব্যাপারে আমি তোমাদের সতর্ক করে দিচ্ছি, তাদের প্রতি কখনো নির্মম হয়ো না। এক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করো। মনে রেখো, তোমাদের স্ত্রীদের ওপর তোমাদের যেমন দাবি ও অধিকার আছে, তোমাদের ওপরও তাদের তেমন দাবি ও অধিকার আছে।" (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
- প্রচার ও প্রসার: "যারা উপস্থিত আছো, তারা অনুপস্থিতদেরকে আমার এই সকল পয়গাম পৌঁছে দেবে।" (সহীহ বুখারী)
- ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি: "সাবধান! ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না। এই সীমা লঙ্ঘনের দরুন তোমাদের পূর্ববর্তী বহু জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে।" (ইবনে মাজাহ)
- নেতৃত্বের আনুগত্য: "যদি কোনো হাবশী কৃতদাসকেও তোমাদের আমীর নিযুক্ত করা হয়, আর সে যদি আল্লাহর বিধান অনুযায়ী তোমাদের পরিচালনা করতে থাকে, তবে তোমরা সর্বতোভাবে তার আদেশ মেনে চলবে।" (সহীহ মুসলিম)
- মানবাধিকার ও ভ্রাতৃত্ব: "অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করো না, ব্যাভিচার করো না। জেনে রাখো, এক মুসলমান অন্য মুসলমানের ভাই।"
উপসংহার
ভাষণশেষে তিনি বললেন, ‘হে মহান প্রভু! আমি কি আপনার দ্বীনের দাওয়াত পরিপূর্ণভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাতে পেরেছি?' উপস্থিত জনতা সবাই সম্মিলিতভাবে বললেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর দ্বীন পরিপূর্ণভাবে পৌঁছাতে পেরেছেন।' তখন তিনি বললেন, ‘হে প্রভু! আপনি শুনুন, আপনি সাক্ষী থাকুন।'
আজ অশান্ত পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ফিরে যেতে হবে সেই চৌদ্দ‘শ বছর আগে। জীবনকে ঢেলে সাজাতে হবে বিদায় হজের ভাষণের সুমহান আদর্শে।
সম্মানিত বন্ধুরা, আসুন ইসলামের রাহে উম্মতে মুহাম্মদীর মুক্তির কথা বলি। আল্লাহপাক আমাদের সবাইকে সে তৌফিক দান করুন, আমিন, সুম্মা আমিন।

Post a Comment