আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত: সঠিক পথের দিশা ও আকিদা
পৃথিবীর বুকে ইসলামের সঠিক রূপ ধরে রাখা এবং নবীপ্রেমের মশাল জ্বালিয়ে রাখার অতন্দ্র প্রহরী হলো 'আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত'। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ এবং সাহাবায়ে কেরামদের জামাত বা আদর্শকে যারা আঁকড়ে ধরে থাকে, তারাই মূলত এই জামাতের অন্তর্ভুক্ত। হাশরের ময়দানে নাজাতপ্রাপ্ত ৭৩ দলের মধ্যে যে একটি দল জান্নাতী হবে, হাদিসের ভাষ্যমতে তারাই হলো এই সত্য পথের অনুসারী।
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা কবিতার চরণে উঠে আসা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মূল বিশ্বাস বা আকিদাগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
১. নবীপ্রেম ও পাক পাঞ্জাতন (আ.)-এর মহব্বত
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মূল ভিত্তি হলো প্রিয় নবী (সা.)-এর প্রতি অগাধ ভালোবাসা। সুন্নী মুসলমানরা বিশ্বাস করে, নবীজিকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসা ইমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শুধু তাই নয়, নবীজির পবিত্র বংশধর অর্থাৎ পাক পাঞ্জাতন (আ.)—হযরত মুহাম্মদ (সা.), হযরত আলী (রা.), হযরত ফাতেমা (রা.), হযরত ইমাম হাসান (রা.) এবং হযরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর প্রতি ভালোবাসা পোষণ করাকে তারা পরকালীন মুক্তির উসিলা মনে করে।
২. পীর-আউলিয়া ও মাজার জিয়ারত
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অনুসারীরা পীর-ফকির এবং আল্লাহর ওলিদের সম্মান করে এবং তাদের দেখানো সরল পথে চলে। তারা মনে করে, ওলিরা হলেন আল্লাহর বন্ধু।
- জিয়ারত বনাম পূজা: এখানে একটি বড় ভুল ধারণা পরিষ্কার করা প্রয়োজন। সুন্নীরা কখনোই মাজার পূজা করে না, বরং তারা মাজার জিয়ারত করে। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা এবং আল্লাহর কাছে তাদের উসিলা দিয়ে মোনাজাত করা সুন্নতি আমল।
৩. পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)
নবীজির শুভাগমন বা জন্মকে সুন্নী জামাত 'ঈদে মিলাদুন্নবী' হিসেবে পালন করে। এটি তাদের কাছে সৃষ্টির সেরা খুশির দিন। মিলাদ ও কিয়ামের মাধ্যমে নবীজির শানে দরুদ ও সালাম পেশ করা এবং শেষে তাবারক বিতরণ করা আহলে সুন্নাতের একটি চিরচেনা সংস্কৃতি, যা একদল লোক 'বিদআত' বললেও সুন্নীরা একে 'ইশক-এ-রাসুল' বা নবীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের মাধ্যম মনে করে।
৪. শবে মেরাজ ও শবে বরাত
আহলে সুন্নাতের আকিদা হলো—নবীজি (সা.)-এর মেরাজ সশরীরে এবং জাগ্রত অবস্থায় হয়েছিল। এটি আল্লাহর এক মহান মোজেজা। এছাড়া লাইলাতুল বরাত বা শবে বরাতে ইবাদত-বন্দেগি করা, হালুয়া-রুটি বা তাবারক বিতরণ এবং সারারাত জেগে মোনাজাত করা সুন্নীদের ঐতিহ্য। যদিও অনেকে একে 'ফাঁকি' বা ভিত্তিহীন বলে দাবি করে, কিন্তু হাদিস ও আসলাফদের আমল দ্বারা এর গুরুত্ব প্রমাণিত।
৫. কারবালা ও আশুরা
আশুরার দিন সুন্নীরা আহলে বায়তের শোকে অশ্রু বিসর্জন দেয়। তারা বিশ্বাস করে, কারবালার যুদ্ধ কোনো 'ভুল বুঝাবুঝির লড়াই' ছিল না, বরং তা ছিল সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী এক লড়াই। ইমাম হোসাইন (রা.) ইসলামের ঝাণ্ডা সমুন্নত রাখতে সপরিবারে শাহাদাত বরণ করেছিলেন, যা কিয়ামত পর্যন্ত সুন্নীদের প্রেরণা হয়ে থাকবে।
৬. নবীজির নূরানী হাকিকত ও শাফায়াত
একটি ভ্রান্ত দল নবীজিকে (সা.) সাধারণ মানুষের মতো 'রক্ত-মাংসের মানুষ' বলে প্রচার করে। কিন্তু আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা হলো—নবীজি বাশার (মানুষ) হওয়া সত্ত্বেও তিনি সাধারণ মানুষের মতো নন, বরং তিনি আল্লাহর সৃষ্টির সেরা 'নূর'।
- শাফায়াত: হাশরের কঠিন ময়দানে যখন সবাই ইয়া নফসি ইয়া নফসি করবে, তখন নবীজি (সা.) উম্মতের জন্য শাফায়াত বা সুপারিশ করবেন। এই বিশ্বাসই সুন্নীদের একমাত্র ভরসা।
৭. ৭৩ ফেরকা ও নাজাতপ্রাপ্ত দল
নবীজি (সা.) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে, যার মধ্যে ৭২টি দল হবে জাহান্নামী এবং মাত্র একটি হবে জান্নাতী। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতই হলো সেই নাজাতপ্রাপ্ত দল, যারা নবী ও সাহাবাদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়নি।
উপসংহার
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত মানেই হলো সকাল-সন্ধ্যায় নবীজির ওপর দরুদ পাঠ করা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুন্নাহর অনুসরণ করা। কালক্ষেপণ না করে যারা নবীজির ভালোবাসা নিয়ে এই দলে শামিল হবে, হাশর, মিজান এবং পুলসিরাতে নবীজিই হবেন তাদের কাণ্ডারী।

Post a Comment