কাবিননামার ১৮ নম্বর ধারা ও স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা: শরীয়ত ও আইনের আলোকে একটি বিস্তারিত সচেতনতামূলক গাইড
নাহমাদুহু ওয়া নুসল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম -আম্মা বা’দ।
বিবাহ একটি পবিত্র বন্ধন। ইসলামে বিবাহকে কেবল একটি সামাজিক প্রথা হিসেবে দেখা হয় না, বরং এটি একটি শক্তিশালী অঙ্গীকার বা 'মিছাকুন গালিজ'। বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে বিবাহ নিবন্ধনের সময় 'নিকাহনামা' বা কাবিননামার ফরম পূরণ করা হয়। এই ফরমের ১৮ নম্বর কলামটি নিয়ে সমাজে অনেক ভুল ধারণা এবং অজ্ঞতা বিদ্যমান। না বুঝে বা না পড়ে স্বাক্ষর করার কারণে পরবর্তীতে অনেক পরিবার ভাঙনের মুখে পড়ে এবং আইনি জটিলতায় জড়িয়ে যায়। আজকের আর্টিকেলে আমরা কাবিননামার ১৮ নম্বর ধারা এবং ইসলামে স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করার বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
১. ইসলামে চুক্তির গুরুত্ব
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। এখানে প্রতিটি লেনদেন এবং চুক্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা চুক্তিসমূহ পূর্ণ কর।" (সূরা মায়িদা, আয়াত: ১)
বিবাহও একটি চুক্তি। এই চুক্তির শর্তগুলো উভয় পক্ষকে যথাযথভাবে পালন করতে হয়। কাবিননামার প্রতিটি ঘর বা কলাম এক একটি শর্তের নামান্তর। তাই স্বাক্ষর করার আগে প্রতিটি ধারা বুঝে নেওয়া ঈমানি দায়িত্ব।
২. তালাকের মূল অধিকার ও তাফওয়ীযে তালাক (تفويض الطلاق)
ইসলামি শরীয়ত অনুযায়ী তালাকের মূল অধিকার আল্লাহর পক্ষ থেকে স্বামীকে দেওয়া হয়েছে। তবে স্বামী চাইলে স্বেচ্ছায় এবং সজ্ঞানে এই অধিকারের কিছু অংশ বা পূর্ণ ক্ষমতা স্ত্রীকে প্রদান করতে পারে। ফিকহ শাস্ত্রের পরিভাষায় একে বলা হয়— ‘তাফওয়ীযে তালাক’ (Tafweez-e-Talaq) বা তালাকের ক্ষমতা অর্পণ।
দলিল:
হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ কিতাব 'আল-হিদায়া' ও 'ফাতাওয়া হিন্দিয়া'তে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে:
إذا فوض الزوج الطلاق إلى زوجته فطلقت نفسها وقع الطلاق
"স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করে, অতঃপর স্ত্রী নিজেকে তালাক দেয়, তাহলে তালাক সংঘটিত হবে।"
অর্থাৎ, স্বামী যদি বলে, "আমি তোমাকে নিজের তালাক নিজে নেওয়ার ক্ষমতা দিলাম" এবং স্ত্রী তা কবুল করে নেয়, তবে স্ত্রী ইচ্ছা করলেই নিজেকে তালাক দিয়ে বিবাহ বন্ধন ছিন্ন করতে পারবে। ১৮ নম্বর কলামে 'হ্যাঁ' লেখার মাধ্যমে মূলত এই আইনি ও শরয়ি ক্ষমতাই স্ত্রীকে দেওয়া হয়।
৩. কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে কী লেখা থাকে?
বাংলাদেশের প্রচলিত নিকাহনামা ফরমের ১৮ নম্বর ঘরে প্রশ্ন করা হয়েছে:
"স্বামী স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা প্রদান করিয়াছেন কি না? করিয়া থাকিলে কি কি শর্তে?"
যদি এই ঘরে 'হ্যাঁ' লিখে স্বামী স্বাক্ষর করেন, তবে তিনি আইনিভাবে স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার অধিকার দিয়ে দিলেন। এখানে দুটি বিষয় হতে পারে:
১. শর্তহীন ক্ষমতা: যদি শুধু 'হ্যাঁ' লেখা থাকে, তবে স্ত্রী যেকোনো সময় নিজেকে তালাক দিতে পারবে।
২. শর্তসাপেক্ষ ক্ষমতা: যদি লেখা থাকে, "স্বামী যদি ভরণপোষণ না দেয় বা শারীরিক নির্যাতন করে, তবে স্ত্রী তালাক দিতে পারবে"—এমন ক্ষেত্রে কেবল ঐ শর্ত লঙ্ঘিত হলেই স্ত্রী তালাক দিতে পারবে।
৪. অজ্ঞতা ও বর্তমান সমাজের করুণ চিত্র
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশের অধিকাংশ বিবাহ অনুষ্ঠানে কাজী বা মুরুব্বিরা বরকে এই ধারাটি পড়ে শোনান না। অনেক সময় তাড়াহুড়ো করে শুধু স্বাক্ষরের কথা বলা হয়। বরও উত্তেজনার বসে বা লজ্জায় না পড়ে স্বাক্ষর করে দেন।
অজ্ঞতার ফলাফল:
- আকস্মিক ডিভোর্স: অনেক স্বামী পরবর্তীতে অবাক হয়ে দেখেন যে তার স্ত্রী তাকে না জানিয়েই তালাক কার্যকর করে ফেলেছে। আইনিভাবে সে এটি করার অধিকার রাখে কারণ স্বামী নিজেই ১৮ নম্বর ঘরে 'হ্যাঁ' লিখে সম্মতি দিয়েছেন।
- পারিবারিক অশান্তি: ক্ষমতার অপব্যবহার অনেক সময় তুচ্ছ কারণেও সংসার ভাঙার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
৫. ফিকহি দলিল ও ওলামাদের মতামত
ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, স্বামী তার তালাকের অধিকার হস্তান্তরের পর তা আর ফেরত নিতে পারে না (যদি ক্ষমতাটি নিঃশর্ত হয়)। এটি একটি আইনি দলিল। ইমাম আবু হানিফা (র.)-এর মতে, স্বামী স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দিলে স্ত্রী ঐ মজলিসেই বা নির্ধারিত শর্ত সাপেক্ষে নিজেকে তালাক দেওয়ার অধিকার রাখে।
৬. সচেতনতামূলক নির্দেশনাবলী (বিয়েপ্রার্থীদের জন্য)
ক. বুঝে স্বাক্ষর করুন:
কাবিননামা শুধু একটি আইনি কাগজ নয়, এটি আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় চুক্তিনামা। স্বাক্ষর করার মানেই হলো আপনি ঐ শর্তে রাজি আছেন। সুতরাং না পড়ে কখনো স্বাক্ষর করবেন না।
খ. কাজীদের দায়িত্ব:
একজন কাজীর নৈতিক দায়িত্ব হলো বরের কাছে প্রশ্নটি পরিষ্কার করে করা। তিনি স্ত্রীকে ক্ষমতা দিতে চান কি না এবং দিলে তা কী শর্তে দেবেন—তা আগে থেকেই আলোচনা করে নেওয়া উচিত।
গ. শর্ত নির্ধারণ করুন:
সচেতন মহলের মতে, ১৮ নম্বর কলামটি একেবারে খালি রাখা বা 'না' লেখা সবসময় বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বরং সেখানে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া যেতে পারে। যেমন— "স্বামী যদি ৩ বছর নিখোঁজ থাকে" বা "স্বামী যদি অমানবিক নির্যাতন করে যা প্রমাণিত হয়"—তবেই স্ত্রী তালাক দিতে পারবে। এতে ক্ষমতার অপব্যবহার কমে।
৭. কিছু ভুল ধারণা ও সংশোধন
অনেকে মনে করেন, ১৮ নম্বর ঘরে 'হ্যাঁ' লিখলে স্বামীর তালাকের ক্ষমতা চলে যায়। এটি ভুল। স্বামীর তালাকের ক্ষমতা আজীবন থাকে। ১৮ নম্বর ঘরের মাধ্যমে কেবল স্ত্রীকেও একটি অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া হয় মাত্র।
৮. উপসংহার
বিবাহ একটি বিশ্বাসের নাম। কিন্তু আইনি জটিলতা এড়াতে এবং ভবিষ্যতে পস্তাতে না হলে বিয়ের আসরে প্রতিটি কাজ সচেতনভাবে করা উচিত। ১৮ নম্বর ধারাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি স্ত্রীকে যেমন সুরক্ষা দেয়, তেমনি অসতর্কতার কারণে স্বামীর জন্য বিপদের কারণ হতে পারে। তাই আসুন, আমরা হুজুগে কাজ না করে শরীয়ত ও আইনের সঠিক জ্ঞান অর্জন করি।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবার দাম্পত্য জীবনকে সুখময় করুন এবং দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।

Post a Comment