আরাফাতের রোজার ফজিলত কি |আরাফাত ময়দানের ইতিহাস |

 


 আরাফার দিনের ফজিলত, নিয়ম ও আমল সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন।আরাফাতের রোজা রাখার নিয়ম |

আরাফাতের রোজার ফজিলত কি |আরাফাত ময়দানের ইতিহাস |


নাহমাদুহু ওয়া নুসল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম -আম্মা বা’দ।

​ইসলামের দৃষ্টিতে বছরের প্রতিটি দিন বা মাসের গুরুত্ব সমান নয়। কিছু দিন এমন রয়েছে, যেগুলোকে আল্লাহ তাআলা অন্য দিনগুলোর ওপর বিশেষ মর্যাদা ও ফজিলত দান করেছেন। তেমনই এক মহিমান্বিত ও বরকতময় দিন হলো আরাফার দিন (Day of Arafah)। এটি জিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখ, যা হজের মূল দিন হিসেবে গণ্য হয়। এই দিনের রোজা, দোয়া এবং ইবাদতের ফজিলত অপরিসীম। বিশেষ করে যারা হজে যেতে পারেননি, তাদের জন্য এই দিনে রোজা রাখা আল্লাহর এক বিশেষ নেয়ামত। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা ২০২৬ সালের আরাফার দিনের সঠিক তারিখ, আরাফার রোজার ফজিলত, বাংলাদেশ ও প্রবাসীদের জন্য রোজা রাখার সঠিক নিয়ম এবং এই দিনের বিশেষ আমলগুলো নিয়ে কোরআন ও হাদিসের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করব।

১. আরাফার দিন কী এবং এর গুরুত্ব (What is the Day of Arafah?)

​আরাফার দিন হলো পবিত্র জিলহজ্জ মাসের ৯ম দিন। এই দিনেই মক্কার অদূরে অবস্থিত ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দানে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা লাখ লাখ হাজি সাহেবরা সমবেত হন। হজের অন্যতম প্রধান রোকন বা ফরয কাজ হলো এই আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "আল-হাজ্জু আরাফাহ" অর্থাৎ, আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করাই হলো মূল হজ (সুনানে নাসায়ী)।

কোরআনের আলোকে আরাফার দিন:

​আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনের সূরা আল-মায়িদাহর ৩ নম্বর আয়াতটি এই আরাফার দিনেই নাযিল করেছিলেন। যেখানে বলা হয়েছে:

​"আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।" (সূরা মায়েদাহ, আয়াত: ৩)


​একজন ইহুদি হযরত ওমর (রা.)-কে বলেছিলেন, "হে আমীরুল মুমিনীন! আপনাদের কিতাবে একটি আয়াত আছে, যা যদি আমাদের ইহুদি জাতির ওপর নাযিল হতো, তবে আমরা সেই দিনটিকে 'ঈদের দিন' হিসেবে উদযাপন করতাম।" হযরত ওমর (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, "কোন আয়াত?" তখন সে এই ৩ নম্বর আয়াতটি পাঠ করল। হযরত ওমর (রা.) উত্তর দিলেন, "আমরা অবশ্যই জানি এই আয়াতটি কখন এবং কোথায় নাযিল হয়েছিল। এটি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর আরাফার মাঠে জুমার দিনে নাযিল হয়েছিল, যা আমাদের জন্য এমনিতেই ঈদের দিন।" (সহীহ বুখারী)।

৩. আরাফার রোজা রাখার ফজিলত (Virtues of the Fast of Arafah)

​যারা হজে যেতে পারেননি, তাদের জন্য এই দিনটির সবচেয়ে বড় আমল এবং পুরস্কার হলো আরাফার দিনের রোজা (Fast of Arafah)। এই একটি রোজার বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা বান্দার জীবনের অনেক গুনাহ মাফ করে দেন।

ক. দুই বছরের গুনাহ মাফ:

​হযরত আবু কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে আরাফার দিনের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন:

​"আমি আল্লাহর কাছে আশা রাখি যে, এই রোজা তার পূর্ববর্তী এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের (ছোট ছোট) গুনাহের কাফফারা বা ক্ষমা হিসেবে গণ্য হবে।" (সহীহ মুসলিম: ১১৬২)।


​কল্পনা করে দেখুন মনির ভাই, মাত্র ১টি দিন রোজা রাখার মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের পেছনের ১ বছর এবং সামনের ১ বছরের গুনাহ মাফ করে দিচ্ছেন! এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে।

খ. জাহান্নাম থেকে মুক্তির দিন:

​আরাফার দিন হলো এমন একটি দিন, যেদিন আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

​"আরাফার দিনের চেয়ে অন্য কোনো দিন আল্লাহ তাআলা এত অধিক সংখ্যক বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন না। আল্লাহ এই দিনে বান্দাদের খুব নিকটবর্তী হন এবং ফেরেশতাদের সামনে গর্ব করে বলেন— দেখ, আমার এই বান্দারা কী চায়?" (সহীহ মুসলিম: ১৩৪৮)।


৪. বাংলাদেশ ও প্রবাসীদের জন্য আরাফার রোজা রাখার সঠিক নিয়ম (The Rule of Keeping Fast)

​আরাফার রোজা নিয়ে প্রতি বছরই সাধারণ মুসলিমদের মনে একটি বড় প্রশ্ন বা বিভ্রান্তি তৈরি হয়— "রোজা কি সৌদি আরবের হাজিদের আরাফাতের মাঠে অবস্থানের দিনে রাখব, নাকি নিজের দেশের জিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখে রাখব?"

​ইসলামি শরীয়তের ফকীহ এবং ওলামাদের মতে এর সুন্দর সমাধান নিচে দেওয়া হলো:

মতামত ১: নিজের দেশের চাঁদ অনুযায়ী রাখা (অধিকাংশ ওলামাদের মত)

​বাংলাদেশ, ভারত বা বিশ্বের যেসব দেশে মক্কার সাথে মিল রেখে চাঁদ দেখা যায় না, তারা তাদের নিজস্ব দেশের জিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখের দিনটিতেই রোজা রাখবেন। কারণ, ইবাদত এবং রোজা সবসময় স্থানীয় চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল। যেমন: বাংলাদেশে যেদিন ৯ই জিলহজ্জ হবে, সেদিনই বাংলাদেশের মানুষের জন্য আরাফার দিন এবং সেদিনই রোজা রাখা হবে।

মতামত ২: হাজিদের অবস্থানের দিন মিল রেখে রাখা

​অনেকে মনে করেন, যেহেতু এই রোজাটির নাম 'আরাফার রোজা', তাই মক্কায় হাজিরা যেদিন আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করছেন, ঠিক সেই দিনটিতেই (চাই সেটা নিজের দেশে ৮ তারিখ বা ৯ তারিখ হোক) রোজা রাখা উচিত।

💡 সবচেয়ে নিরাপদ ও বুদ্ধিমান কাজ (২টি রোজা রাখা):

​মনির ভাই, এই বিভ্রান্তি বা মতভেদ থেকে বাঁচতে এবং নিশ্চিতভাবে দুই বছরের গুনাহ মাফের সওয়াব পাওয়ার সবচেয়ে উত্তম উপায় হলো— জিলহজ্জ মাসের ৮ এবং ৯ তারিখ (টানা দুটি) রোজা রাখা। যদি আপনি ৮ ও ৯ তারিখ দুই দিনই রোজা রাখেন, তবে সৌদি আরবের সাথে মিল রেখে হলেও আপনার রোজা মিস হবে না, আবার বাংলাদেশের তারিখ অনুযায়ী হলেও আপনার রোজা মিস হবে না। এটিই হচ্ছে সবচেয়ে নিরাপদ আমল।

৫. আরাফার দিনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আমলসমূহ

​শুধু রোজা রাখাই নয়, আরাফার পুরো দিনটিই হলো দোয়া কবুল এবং জিকিরের সেরা সময়। এই দিনে নিচের আমলগুলো বেশি বেশি করা উচিত:

১. আরাফার দিনের বিশেষ দোয়া পাঠ করা:

​রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "সবচেয়ে উত্তম দোয়া হলো আরাফার দিনের দোয়া।" তিনি এই দিনে নিজে নিচের দোয়াটি বেশি বেশি পড়তেন এবং সাহাবিদের পড়তে বলতেন:


উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর।

অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো অংশীদার নেই। রাজত্ব একমাত্র তাঁরই এবং সমস্ত প্রশংসাও তাঁরই। তিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান। (জামে আত-তিরমিযী)।


২. তাকবীরে তাশরীক পাঠ করা:

​জিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখ ফজর নামাজ থেকে শুরু করে ১৩ তারিখ আসর নামাজ পর্যন্ত (মোট ২৩ ওয়াক্ত) প্রত্যেক ফরয নামাজের পর পুরুষদের জন্য উচ্চস্বরে এবং নারীদের জন্য মনে মনে একবার এই তাকবীর বলা ওয়াজিব:

"আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।"


৩. বেশি বেশি তাওবা ও ইস্তিগফার করা:

​যেহেতু এই দিনে আল্লাহ তাআলা কোটি কোটি মানুষকে ক্ষমা করেন, তাই নিজের জীবনের ছোট-বড় সব গুনাহের জন্য আল্লাহর কাছে চোখের পানি ফেলে আস্তাগফিরুল্লাহ বলে তাওবা করা উচিত।

৬. আরাফার দিনে যা করা থেকে বিরত থাকবেন

​এই পবিত্র দিনে কিছু কাজ থেকে আমাদের কঠোরভাবে বিরত থাকা উচিত, যাতে আমাদের আমল নষ্ট না হয়ে যায়:

  • গুনাহের কাজ থেকে দূরে থাকা: চোখের গুনাহ, কানের গুনাহ এবং মুখের গুনাহ (গীবত বা পরনিন্দা) থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা। কারণ, মহিমান্বিত সময়ে গুনাহের ভয়াবহতাও বেশি হয়।
  • রোজা রেখে অবহেলা না করা: রোজা রেখে শুধু ঘুমিয়ে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় নষ্ট না করে কোরআন তিলাওয়াত এবং জিকিরে সময় কাটানো উচিত।

উপসংহার

​আরাফার দিন হলো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার পক্ষ থেকে উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য এক মহিমান্বিত উপহার। বছরের সেরা এই দিনটিকে অবহেলায় হারিয়ে যেতে দেওয়া কোনো বুদ্ধিমান মুমিনের কাজ হতে পারে না। যারা হজের মহাসমাবেশে অংশ নিতে পারেননি, তাদের জন্য ঘরে বসেই দুই বছরের গুনাহ মাফ করিয়ে নেওয়ার এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার এটিই সুবর্ণ সুযোগ। আসুন, আমরা আগে থেকেই প্রস্তুতি নিই যেন ২০২৬ সালের জিলহজ্জ মাসের এই বরকতময় দিনটিতে রোজা, দোয়া এবং ইস্তিগফারের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারি।

​আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আরাফার দিনের মর্যাদা বোঝার এবং এই দিনে বেশি বেশি নেক আমল করার তাওফিক দান করুন। আমীন।



0 Comments

Post a Comment

Post a Comment (0)

Previous Post Next Post