কুরবানির পশু নিজে জবাই করার নিয়ম। কুরবানির পশু জবাই করার সময় নাম কিবাভে নিবেন।


নিজে কুরবানির পশু জবাই করার নিয়ম, দোয়া এবং নামের নিয়ত করার সঠিক পদ্ধতি

নিজে কুরবানির পশু জবাই করার নিয়ম, দোয়া এবং নামের নিয়ত করার সঠিক পদ্ধতি"


নাহমাদুহু ওয়া নুসল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম -আম্মা বা’দ।

​ঈদুল আজহা বা কুরবানির ঈদ মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি মহান ইবাদতের দিন। সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলমানের ওপর কুরবানি করা ওয়াজিব। কুরবানির পশু জবেহ করার মাধ্যমে বান্দা মূলত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও হযরত ইসমাইল (আ.)-এর মহান আত্মত্যাগের স্মৃতিকে জীবিত করে। তবে আমাদের সমাজে কুরবানির পশু জবাই করার জন্য সাধারণত হুজুর বা ইমাম সাহেবদের ওপর নির্ভর করা হয়। কিন্তু ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী, নিজের কুরবানি নিজে করা কি জায়েজ? কীভাবে পশু জবাই করতে হয় এবং জবেহ করার সময় কী কী দোয়া ও নিয়ত পড়তে হয়— এই বিষয়গুলো জানা প্রতিটি মুসলিমের জন্য জরুরি। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা কুরবানির সঠিক নিয়ম ও দোয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

১. নিজের কুরবানির পশু কি নিজে জবাই করা যাবে?

উত্তর হলো: হ্যাঁ, নিজের কুরবানির পশু নিজে জবাই করা কেবল জায়েজই নয়, বরং এটিই হলো ইসলামের সবচেয়ে উত্তম এবং সুন্নাত পদ্ধতি।

​রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর নিজের কুরবানির পশু সবসময় নিজের পবিত্র হাতে জবাই করতেন। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদিসে এসেছে:

​"রাসূলুল্লাহ ﷺ দুটি শিংওয়ালা চিতাবাঘ রঙা (সাদা-কালো মিশ্রিত) দুম্বা কুরবানি করেছিলেন। তিনি নিজের পা পশুর কাঁধের ওপর রাখলেন, আল্লাহর নাম স্মরণ করলেন (বিসমিল্লাহ বললেন), তাকবীর দিলেন (আল্লাহু আকবার বললেন) এবং নিজ হাতে সে দুটি জবেহ করলেন।" (সহীহ বুখারী: ৫৫৫৮)।


যদি নিজে জবাই করতে না পারেন:

​কোনো ব্যক্তি যদি ভয়, অসুস্থতা বা সঠিক নিয়মের না জানার কারণে নিজে জবাই করতে না পারেন, তবে অন্য কাউকে (যেমন ইমাম বা কোনো অভিজ্ঞ ব্যক্তি) দিয়ে জবাই করাতে পারবেন। তবে সুন্নাত হলো— জবাইয়ের সময় নিজের পশুর সামনে উপস্থিত থাকা। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর কন্যা হযরত ফাতিমা (রা.)-কে বলেছিলেন, "হে ফাতিমা! ওঠো এবং তোমার কুরবানির পশুর কাছে গিয়ে দাঁড়াও। কারণ, এর রক্তের প্রথম ফোঁটা মাটিতে পড়ার সাথে সাথেই তোমার পূর্বের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।" (মুসতাদরাকে হাকেম)।

২. কুরবানির পশু যেভাবে প্রস্তুত ও শোয়াতে হবে (পদ্ধতি)

​পশুকে কষ্ট না দিয়ে অত্যন্ত দয়া ও ইহসানের সাথে জবাই করার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। পশু শোয়ানোর জন্য নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:

  • ছুরি ধারালো করা: পশু জবাই করার ছুরিটি আগেই খুব ভালো করে ধার দিয়ে নিতে হবে, যাতে পশুর কষ্ট কম হয়। তবে পশুর সামনে ছুরি ধার দেওয়া মাকরূহ।
  • পশুকে শান্ত রাখা: পশুকে টেনে-হিঁচড়ে বা কষ্ট দিয়ে জবেহ করার স্থানে নেওয়া যাবে না। এক পশুর সামনে অন্য পশুকে জবাই করা অনুচিত।
  • কিবলামুখী করে শোয়ানো: পশুকে বাম কাতে (বাম পাশ নিচে দিয়ে) শুইয়ে দিতে হবে, যাতে পশুর মুখ এবং পাগুলো পবিত্র কিবলা (পশ্চিম) মুখী থাকে। জবেহকারীর মুখও কিবলার দিকে থাকবে।

৩. পশু জবাই করার সময় কোন কোন রগ কাটতে হবে?


​জবাই করার সময় গলার নিচের অংশে ধারালো ছুরি দিয়ে দ্রুত চালাতে হবে। ইসলামি শরীয়ত অনুযায়ী, পশু সম্পূর্ণ হালাল হওয়ার জন্য গলার ৪টি প্রধান রগ কাটা জরুরি:

১. খাদ্যনালী (যা দিয়ে খাদ্য ভেতরে যায়)

২. শ্বাসনালী (যা দিয়ে পশু শ্বাস নেয়)

৩. এবং ৪. শাহরগ বা দুটি রক্তনালী (গলার দুপাশে থাকা দুটি মোটা রগ)।

​এই ৪টি রগের মধ্যে অন্তত ৩টি রগ অবশ্যই কাটতে হবে। ৩টি রগ কেটে রক্ত বের হয়ে গেলেই পশু হালাল হয়ে যায়। রগ কাটার পর পশুর প্রাণ সম্পূর্ণ বের হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। প্রাণ থাকা অবস্থায় চামড়া ছিলা বা পা কাটা সম্পূর্ণ হারাম ও মাকরূহ।

৪. কুরবানির দোয়া ও নাম নেওয়ার সঠিক নিয়ম

​কুরবানির সময় দোয়া এবং কার নামে কুরবানি হচ্ছে— তার নিয়ত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি মূলত ৩টি ধাপে করতে হয়:

ধাপ ১: পশুকে শোয়ানোর পর পড়ার দোয়া

​পশুকে যখন কিবলামুখী করে শোয়ানো হবে, তখন জবেহ করার ঠিক আগ মুহূর্তে এই দোয়াটি পড়া সুন্নাত (যদি মুখস্থ না থাকে তবে না পড়লেও কুরবানি হয়ে যাবে, তবে পড়া উত্তম):

উচ্চারণ: ইন্নী ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাযী ফাতারাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদা হানীফাও ওয়া মা আনা মিনাল মুশরিকীন। ইন্না সালাতী ওয়া নুশুকী ওয়া মাহইয়াইয়া ওয়া মামাতী লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন। লা শারীকা লাহু ওয়া বিযালিকা উমিরতু ওয়া আনা মিনাল মুসলিমীন।

এরপর বলবেন: "আল্লাহুম্মা মিনকা ওয়া লাকা" (হে আল্লাহ, এটি তোমার পক্ষ থেকেই প্রাপ্ত এবং তোমার জন্যই উৎসর্গীকৃত)।


ধাপ ২: ছুরি চালানোর মূল দোয়া (ফরয বা ওয়াজিব)

​ছুরি চালানোর একদম শেষ মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে মুখ ফুটে বলতে হবে:

উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার।

অর্থ: আল্লাহর নামে এবং আল্লাহ সবচেয়ে মহান।


( ইচ্ছাকৃতভাবে যদি কেউ 'বিসমিল্লাহ' না বলে জবাই করে, তবে সেই পশুর মাংস খাওয়া হালাল হবে না। তাই ছুরি চালানোর সময় অবশ্যই "বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার" বলতে হবে।)

ধাপ ৩: নামের নিয়ত কীভাবে করবেন এবং নাম কখন নিতে হবে?

​আমাদের সমাজে একটা ভুল ধারণা আছে যে, জবেহ করার সময় মুখে সবার নাম রিডিং পড়তে হবে। আসলে নামের নিয়ত আপনি জবাই করার আগেও মনে মনে করতে পারেন, আবার জবাই করার পরেও দোয়ার মাধ্যমে করতে পারেন

সবচেয়ে সহজ এবং সহীহ পদ্ধতি হলো:

১. আপনি যখন পশুটি কিনেছেন বা টাকা দিয়েছেন, তখনই আল্লাহর দরবারে নিয়ত হয়ে গেছে যে এটি কার নামে হচ্ছে। বড় গরুর ক্ষেত্রে ৭ নাম বা নিজের পরিবারের নাম মনে মনে বা মুখে আগে থেকেই ঠিক করে রাখবেন।

২. জবেহ করার সময় শুধু "বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার" বলে ছুরি চালিয়ে দেবেন।

৩. পশু জবাই করা শেষ হয়ে গেলে নিচের কবুল হওয়ার দোয়াটি পড়বেন এবং তখন নামগুলো মুখে উচ্চারণ করবেন।

জবাই করার পরের দোয়া ও নাম উচ্চারণ:

​পশু জবেহ করা সম্পন্ন হলে এই দোয়াটি পড়বেন:

"আল্লাহুম্মা তাকাব্বালহু মিন্নী..." (যদি নিজের কুরবানি হয়, তবে বলবেন 'মিন্নী' অর্থাৎ আমার পক্ষ থেকে। আর যদি অন্যের বা কয়েকজনের নামে হয়, তবে বলবেন 'মিন...' বলে তাদের নামগুলো বা বাবার নাম এক এক করে মুখে উচ্চারণ করবেন)।


​পুরো দোয়াটি হলো:

"আল্লাহুম্মা তাকাব্বালহু মিন [এখানে নামগুলো বলবেন]- কামা তাকাব্বালতা মিন হাবীবিকা মুহাম্মাদিন ওয়া খালীলিকা ইব্রাহীমা আলাইহিমাস সালাতু ওয়াস সালাম।"


৫. অংশীদারদের (ভাগীদারদের) নাম নেওয়ার ক্ষেত্রে জরুরি মাসআলা

​বড় পশু (গরু, মহিষ, উট) যদি ভাগে কুরবানি দেওয়া হয় (সর্বোচ্চ ৭ ভাগে), তবে নাম নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় খেয়াল রাখতে হবে:

  • নাম ভুল হলে কি কুরবানি হবে? যদি জবাইয়ের সময় তাড়াহুড়োয় কারও নাম মুখে উচ্চারণ করতে ভুল হয় বা বাদ পড়ে যায়, তবুও কুরবানি ১০০% সহীহ হয়ে যাবে। কারণ আল্লাহ নিয়ত দেখেন, মুখের উচ্চারণ নয়।
  • টাকা হালাল হওয়া শর্ত: ভাগে কুরবানি দেওয়ার সময় নিশ্চিত হতে হবে যে, ৭ জনের সবার উপার্জনের টাকা যেন হালাল হয়। একজনের টাকাও যদি হারাম বা সুদের হয়, তবে বাকি ৬ জনের কুরবানিও বাতিল হয়ে যাবে।
  • জবেহকারীর পারিশ্রমিক: যিনি পশু জবাই করবেন বা কসাইয়ের কাজ করবেন, তাকে কুরবানির পশুর মাংস বা চামড়া দিয়ে মজুরি দেওয়া যাবে না। তাকে টাকা দিয়ে আলাদা মজুরি দিতে হবে। তবে পারিশ্রমিক পরিশোধের পর সাধারণ মানুষ হিসেবে তাকে ভালোবেসে মাংস উপহার দেওয়া যাবে।

উপসংহার

​কুরবানি কেবল একটি উৎসব নয়, এটি একটি খাঁটি ইবাদত। তাই লোকদেখানো মানসিকতা পরিহার করে সম্পূর্ণ সুন্নাত উপায়ে নিজে কুরবানি করার চেষ্টা করা উচিত। যদি নিজে সাহস না পান, তবে অভিজ্ঞ কাউকে দিয়ে জবেহ করানোর সময় অন্তত নিজে সামনে দাঁড়িয়ে "বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার" ধ্বনি দিয়ে আল্লাহর তাকবীর বুলন্দ করুন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সহীহ সুন্নাত তরিকায় কুরবানি করার এবং আমাদের এই কোরবানিকে কবুল করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

নিজের কুরবানির পশু নিজেই জবাই করুন।

কুরবানির পশু কিবাভে জবাই করবেন।

0 Comments

Post a Comment

Post a Comment (0)

Previous Post Next Post