বৈধ পথে প্রবাসীদের ভরসা: রেমিট্যান্স কার্ড কী, কীভাবে পাবেন এবং আবেদনের নিয়ম
পরিশ্রমের উপার্জিত টাকা নিরাপদে এবং সহজে দেশে পরিবারের কাছে পাঠাতে প্রবাসীদের প্রথম পছন্দ এখন রেমিট্যান্স কার্ড। অবৈধ বা হুন্ডির পথ পরিহার করে বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠাতে উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ সরকার এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক প্রবাসীদের জন্য চমৎকার সব রেমিট্যান্স কার্ডের সুবিধা দিচ্ছে।
আজকের আর্টিকেলে আমরা জানবো রেমিট্যান্স কার্ড কী, এর সুবিধাগুলো কী কী এবং এটি পাওয়ার জন্য কীভাবে আবেদন করবেন।
রেমিট্যান্স কার্ড কী?
সহজ কথায়, রেমিট্যান্স কার্ড হলো প্রবাসীদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি এক ধরণের ডেবিট বা প্রিপেইড কার্ড। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীরা বিদেশ থেকে সরাসরি দেশে থাকা তাদের নিজস্ব বা পরিবারের সদস্যের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাতে পারেন।
বাংলাদেশে সাধারণত দুই ধরণের রেমিট্যান্স কার্ড দেখা যায়:
১. সরকারি রেমিট্যান্স কার্ড: ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড কর্তৃক প্রদত্ত বিশেষ কার্ড।
২. ব্যাংক-ভিত্তিক রেমিট্যান্স প্রিপেইড কার্ড: দেশের শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো (যেমন- ইসলামী ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ইত্যাদি) প্রবাসীদের জন্য এই কার্ড ইস্যু করে থাকে।
রেমিট্যান্স কার্ডের মূল সুবিধাসমূহ
- সরকারি প্রণোদনা: বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠালে সরকার ঘোষিত আড়াই শতাংশ (2.5\%) বা তার বেশি নগদ প্রণোদনা সরাসরি অ্যাকাউন্টে যোগ হয়।
- সহজ ক্যাশ আউট: দেশের যেকোনো এটিএম (ATM) বুথ থেকে কোনো বাড়তি ঝামেলা ছাড়াই টাকা তোলা যায়।
- কেনাকাটা ও বিল পরিশোধ: এই কার্ড দিয়ে দেশের বিভিন্ন সুপারশপ, রেস্টুরেন্ট বা অনলাইন শপিংয়ে পেমেন্ট করা যায়।
- বিশেষ ছাড় ও সিআইপি মর্যাদা: সরকারি কার্ডধারীরা বিমানবন্দরে বিশেষ সুবিধা, হাসপাতালে ছাড় এবং দেশে বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সিআইপি (CIP) মর্যাদার জন্য অগ্রাধিকার পান।
রেমিট্যান্স কার্ড পাওয়ার যোগ্যতা
একটি রেমিট্যান্স কার্ডের জন্য আবেদন করতে হলে সাধারণত নিচের যোগ্যতাগুলো থাকতে হয়:
- আবেদনকারীকে অবশ্যই একজন প্রবাসী বা রেমিট্যান্স অর্জনকারী হতে হবে।
- বৈধ পাসপোর্ট এবং সংশ্লিষ্ট দেশের ওয়ার্ক পারমিট বা ভিসা থাকতে হবে।
- বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি হতে হবে।
- দেশে টাকা প্রাপ্তির জন্য একজন মনোনীত ব্যক্তি (Nominee) থাকতে হবে।
রেমিট্যান্স কার্ডের জন্য আবেদন করার নিয়ম
রেমিট্যান্স কার্ড মূলত দুইভাবে সংগ্রহ করা যায়। নিচে বিস্তারিত নিয়ম দেওয়া হলো:
১. সরকারি ওয়েজ আর্নার্স কার্ডের জন্য আবেদন (অনলাইন/অফলাইন)
- প্রয়োজনীয় কাগজপত্র: পাসপোর্ট সাইজ ছবি, পাসপোর্টের কপি, ভিসার কপি, এবং বিএমইটি (BMET) স্মার্ট কার্ড।
- আবেদন প্রক্রিয়া: প্রবাসে যাওয়ার আগে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET) অফিস থেকে বা প্রবাসে যাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস/হাইকমিশনের মাধ্যমে নির্ধারিত ফি দিয়ে আবেদন করা যায়। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে অনলাইনে 'আমি প্রবাসী' অ্যাপ বা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের ওয়েবসাইটের মাধ্যমেও আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়।
২. বাণিজ্যিক ব্যাংকের রেমিট্যান্স প্রিপেইড কার্ডের আবেদন
দেশের প্রায় সব বড় বড় ব্যাংকই এখন প্রবাসীদের জন্য স্পেশাল কার্ড দিচ্ছে। এর আবেদন প্রক্রিয়া খুবই সহজ:
- ধাপ ১ (ব্যাংক নির্বাচন): প্রথমে আপনার পছন্দের ব্যাংক (যেমন: ইসলামী ব্যাংক রেমিট্যান্স কার্ড বা ডাচ-বাংলা ব্যাংক নেক্সাস রেমিট্যান্স কার্ড) নির্বাচন করুন।
-
ধাপ ২ (কাগজপত্র সংগ্রহ):
- প্রবাসীর পাসপোর্ট এবং ভিসার ফটোকপি।
- প্রবাসীর পাসপোর্ট সাইজের ছবি।
- দেশে যিনি টাকা তুলবেন (নমিনী), তার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) এবং ১ কপি ছবি।
- ধাপ ৩ (ফরম পূরণ ও জমা): দেশে থাকা নমিনী বা সুবিধাভোগী উক্ত ব্যাংকের যেকোনো শাখায় গিয়ে "রেমিট্যান্স প্রিপেইড কার্ড" এর আবেদন ফরম পূরণ করবেন এবং কাগজপত্র জমা দেবেন।
- ধাপ ৪ (কার্ড সংগ্রহ): ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে সাধারণত ৩ থেকে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে একটি সচল রেমিট্যান্স কার্ড প্রবাসীর পরিবারের হাতে তুলে দেয়।
শেষ কথা
হুন্ডি বা অবৈধ পথে টাকা পাঠানো দেশের অর্থনীতির জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি আপনার কষ্টার্জিত টাকার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। রেমিট্যান্স কার্ড ব্যবহার করে বৈধ উপায়ে টাকা পাঠানো এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে সহজ এবং লাভজনক। তাই আজই আপনার সুবিধাজনক ব্যাংকে যোগাযোগ করে একটি রেমিট্যান্স কার্ড সংগ্রহ করুন এবং দেশের উন্নয়নে অংশীদার হোন।
Post a Comment