ট্রাম্পের ওপর সৌদি যুবরাজের চাপ ইরানের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে

 

ট্রাম্পের ওপর সৌদি যুবরাজের চাপ: ইরানে কি বড় যুদ্ধ আসন্ন? (নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর রিপোর্ট)"


​মধ্যপ্রাচ্যে নতুন মেরুকরণ: ট্রাম্পের ওপর সৌদি যুবরাজের চাপ এবং ইরানের ভবিষ্যৎ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | মার্চ ২০২৬

​বর্তমান বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু এখন মধ্যপ্রাচ্য। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের পর এই অঞ্চলের সমীকরণ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর একটি চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন বিশ্বজুড়ে আলোচনার ঝড় তুলেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান (MBS) ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখতে নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সরাসরি চাপ দিচ্ছেন।

​এই ঘটনাপ্রবাহ কেবল একটি যুদ্ধ নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যকে নতুনভাবে গড়ে তোলার একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আজকের আর্টিকেলে আমরা এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির গভীর বিশ্লেষণ করব।

​১. ঐতিহাসিক সুযোগ ও মোহাম্মদ বিন সালমানের দর্শন

​সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মনে করেন, বর্তমান সময়টি মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র এবং রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনের জন্য একটি ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’। ট্রাম্পের সাথে সাম্প্রতিক কয়েকটি ফোনালাপে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, ইরানকে দমানোর এটাই শ্রেষ্ঠ সময়। যুবরাজের মতে, ইরানের বর্তমান কট্টরপন্থি সরকার কেবল সৌদি আরবের জন্যই নয়, বরং পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী হুমকি।

​তিনি ট্রাম্পকে এই বার্তা দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের এই যৌথ সামরিক অভিযান যদি সফল হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব চিরতরে খর্ব করা সম্ভব হবে। এটি এই অঞ্চলকে একটি নতুন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক যুগে প্রবেশ করাবে যেখানে সৌদি আরবের আধিপত্য আরও সুসংহত হবে।

​২. ইরানের কট্টরপন্থি সরকারকে উৎখাতের পরিকল্পনা

​প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পকে ইরানের সরকারকে সম্পূর্ণভাবে অপসারণ বা ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর জন্য উৎসাহিত করছেন। সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের অভিযোগ যে, ইরান প্রক্সি যুদ্ধের মাধ্যমে ইয়েমেন, সিরিয়া, লেবানন এবং ইরাকে অস্থিতিশীলতা জিইয়ে রেখেছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলোতে বিগত বছরগুলোতে হওয়া হামলার পেছনে সরাসরি ইরানের মদদ রয়েছে বলে রিয়াদ বিশ্বাস করে। তাই যুবরাজ চাইছেন, এবারের অভিযানে যেন কেবল সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস না করে, বরং রাজনৈতিক আমূল পরিবর্তন আনা হয়।

​৩. ট্রাম্পের দ্বিমুখী অবস্থান: আলোচনা নাকি যুদ্ধ?

​প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান এই পরিস্থিতিতে বেশ রহস্যময়। একদিকে তিনি সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেছেন যে, ইরানের সাথে তার সরকারের ‘কার্যকর আলোচনা’ হয়েছে। অন্যদিকে, তিনি মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সামরিক প্রস্তুতির সংকেত দিচ্ছেন। গত সোমবার (২৩ মার্চ) ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান আলোচনার টেবিলে নমনীয় হচ্ছে। তবে তেহরান এই দাবিকে সরাসরি অস্বীকার করে একে ‘মিথ্যা প্রচারণা’ বলে অভিহিত করেছে।

​ট্রাম্পের এই দ্বিমুখী নীতি মূলত সৌদি আরব এবং ইসরায়েলকে আশ্বস্ত রাখার পাশাপাশি মার্কিন ভোটারদের যুদ্ধের ভয় থেকে দূরে রাখার একটি কৌশল হতে পারে। ট্রাম্প জানেন যে, ইরানে সরাসরি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সেটি মার্কিন অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

​৪. তেল স্থাপনায় হামলার আশঙ্কা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি

​সৌদি ও মার্কিন প্রশাসনের অনেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সরাসরি ইরানের অভ্যন্তরে হামলা বাড়ায়, তবে ইরান পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে সৌদি আরবের বৃহত্তম তেল স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাতে পারে।

​২০১৯ সালের আবকাইক-খুরাইস হামলার স্মৃতি এখনো রিয়াদের জন্য একটি বড় আতঙ্ক। যদি বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হয়, তবে তেলের দাম ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে ধস নামাবে। এই ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও মোহাম্মদ বিন সালমানের এমন আক্রমণাত্মক অবস্থান অনেককে অবাক করেছে।

​৫. মধ্যপ্রাচ্যের নতুন মানচিত্র: ইসরায়েল-সৌদি অক্ষশক্তি

​বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে ইসরায়েল এবং সৌদি আরব কার্যত একই নৌকার যাত্রী। আব্রাহাম অ্যাকর্ডস বা ইব্রাহিম চুক্তির পর থেকে এই দুই দেশের সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। যদিও সৌদি আরব সরাসরি ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ঘোষণা দেয়নি, তবে ইরানের বিরুদ্ধে তাদের এই গোপন ও প্রকাশ্য সহযোগিতা মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন ‘অক্ষশক্তি’ গড়ে তুলছে। এই জোটের মূল লক্ষ্য হলো ইরানের ‘রেজিস্ট্যান্স ব্লক’ (হিজবুল্লাহ, হামাস, হুতি) ভেঙে দেওয়া।

​৬. অস্থিতিশীলতার পথে বিশ্ব?

​দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, যদি ট্রাম্প সৌদি যুবরাজের চাপে সাড়া দিয়ে ইরানের ওপর হামলা আরও জোরালো করেন, তবে তা একটি আঞ্চলিক মহাযুদ্ধে রূপ নিতে পারে। রাশিয়া এবং চীনের অবস্থানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ইরানকে এই দুই পরাশক্তি সমর্থন দিলে যুদ্ধটি আর কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

​উপসংহার

​ইরান এবং সৌদি আরবের এই দ্বন্দ্ব বহু পুরনো। কিন্তু মোহাম্মদ বিন সালমানের নতুন দর্শন এবং ট্রাম্পের অনিশ্চিত পররাষ্ট্রনীতি এই সংকটকে এক বিপজ্জনক মোড়ে নিয়ে এসেছে। যুবরাজ যেটিকে ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’ বলছেন, সেটি শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি নাকি ধ্বংস বয়ে আনে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটি নিশ্চিত যে, ২০২৬ সালের এই সময়টি বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসের একটি বড় বাঁক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

আরো বিস্তারিত দেখুন 

0 Comments

Post a Comment

Post a Comment (0)

Previous Post Next Post