গাজী ইলমুদ্দিন এর জীবনী | আশেকে রাসূল গাজী ইলমুদ্দিন জিবনি


​আশেকে রাসুল হওয়ার মাপকাঠি: বাহ্যিক লেবাস, অন্তরের মহব্বত ও ইতিহাসের এক কাঠমিস্ত্রি

গাজী ইলমুদ্দিন ও আল্লামা ইকবাল অথবা আশেকে রাসুল হওয়ার মাপকাঠি.


​আজকের সমাজে একটি চিরন্তন বিতর্ক প্রায়ই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে—প্রকৃত আশেকে রাসুল বা রাসুলুল্লাহ (সা:)-এর সত্যিকারের প্রেমিক হতে গেলে কি কেবলই বড় বড় দাড়ি, টুপি, সুন্নতি জুব্বা কিংবা পাগড়ির প্রয়োজন? নাকি এর জন্য প্রয়োজন কেবলই অন্তরের এক বুক খাঁটি মহব্বত?

​এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে আজ থেকে এক শতাব্দী আগে, ১৯২৩ সালের অবিভক্ত ভারতের লাহোরে। যেখানে একজন সাধারণ কাঠমিস্ত্রি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে, আল্লাহর রাসুলের প্রতি ভালোবাসা কোনো লেবাস বা সামাজিক মর্যাদার তোয়াক্কা করে না।

​ইতিহাসের সেই অমর নাম: কাঠমিস্ত্রি ইলমুদ্দিন

​১৯২৩ সালের কথা। ভারতের লাহোরে 'রঙ্গিলা রাসুল' নামক একটি চরম আপত্তিকর ও অবমাননাকর বই প্রকাশ করে হিন্দু প্রকাশক রাজপাল। এই বইটির কারণে গোটা ভারতবর্ষের মুসলিমদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। আইনি লড়াইয়েও যখন সেই প্রকাশকের কোনো শাস্তি হচ্ছিল না, তখন মুসলিম উম্মাহর ক্ষোভ আকাশ ছুঁয়েছিল।

​ঠিক সেই মুহূর্তে মঞ্চে আবির্ভাব ঘটে ১৯ বছর বয়সী এক সাধারণ যুবকের। নাম তাঁর ইলমুদ্দিন। পেশায় একজন অতি সাধারণ কাঠমিস্ত্রি। কোনো বড় মাদ্রাসার ডিগ্রি তাঁর ছিল না, ছিল না কোনো বাহ্যিক আড়ম্বর। কিন্তু তাঁর বুকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা:)-এর সম্মানের প্রতি এক আকাশচুম্বী ভালোবাসা।

​১৯২৯ সালের ৬ এপ্রিল, এই সাধারণ কাঠমিস্ত্রি ইলমুদ্দিন সেই কুখ্যাত প্রকাশক রাজপালকে হত্যা করে প্রিয় নবীজি (সা:)-এর অবমাননার জবাব দেন।

​আদালতের কাঠগড়ায় অটল এক আশেক

​গ্রেপ্তারের পর তৎকালীন মুসলিম সমাজের বড় বড় আইনজীবী ও এডভোকেটগণ ইলমুদ্দিনকে বাঁচাতে চাইলেন। তারা পরামর্শ দিলেন, "ইলমুদ্দিন, তুমি আদালতে বলবে যে ঘটনার সময় তোমার মানসিক ভারসাম্য ঠিক ছিল না, তুমি সজ্ঞানে এটি করোনি।" তাহলে হয়তো ফাঁসি থেকে বেঁচে যাওয়া সম্ভব ছিল।

​কিন্তু রাসুলের এই খাঁটি আশেক আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বুক ফুলিয়ে বললেন:

​"আমি স্বেচ্ছায় এবং সজ্ঞানে তাকে হত্যা করেছি। কারণ সে আমার প্রিয় রাসুল (সা:)-কে অবমাননা করেছে। আমি আমার নবীজির ইজ্জতের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত।"


​পরবর্তীতে আইনজীবীরা যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কেন নিজের জীবন বিপন্ন করলেন? তখন ইলমুদ্দিন এক আবেগঘন উত্তর দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, স্বপ্নে স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা:) তাঁকে এসে বলেছেন, "ইলমুদ্দীন, তুমি তাড়াতাড়ি আসো, আমি জান্নাতে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।"

​কবি ইকবালের সেই ঐতিহাসিক আক্ষেপ

​১৯২৯ সালের ৩১ অক্টোবর ইলমুদ্দিনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তাঁর জানাজার ইমামতি করেছিলেন তৎকালীন প্রখ্যাত বুজুর্গ আল্লামা জাফর আলী খান। আর তাঁর খাটিয়া বহন ও লাশ দাফন করেছিলেন বিশ্ববিখ্যাত কবি ও দার্শনিক আল্লামা ড. মুহাম্মদ ইকবাল

​কবরে লাশ শায়িত করার সময় অশ্রুসজল চোখে কবি ইকবাল একটি ঐতিহাসিক কথা বলেছিলেন, যা আজো প্রতিটি মুসলিমকে ভাবিয়ে তোলে:

​"আমরা শুধু কেতাবই পড়তে থাকলাম, আর এই মূর্খ (প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন) ছেলেটি আজ সমস্ত শিক্ষিতদের ছাড়িয়ে গেলো এবং বাজি জিতে নিলো।"


​বাহ্যিক লেবাস বনাম অন্তরের মহব্বত: ইসলাম কী বলে?

​ইলমুদ্দিনের এই ঘটনা আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়—আল্লাহর রাসুলের প্রতি মহব্বত কোনো বাহ্যিক পোশাক বা সামাজিক স্ট্যাটাসের ওপর নির্ভর করে না।

​ইসলামে দাড়ি রাখা, টুপি পরা বা জুব্বা পরা নিঃসন্দেহে রাসুলুল্লাহ (সা:)-এর অতি উত্তম সুন্নাহ। একজন মুমিন যখন অন্তরে রাসুলকে ভালোবাসে, তখন স্বভাবতই তাঁর অবয়ব ও পোশাক নিজের মধ্যে ধারণ করার ইচ্ছা জাগে। তবে কেবল বাহ্যিক লেবাসই আশেকে রাসুল হওয়ার একমাত্র মাপকাঠি নয়।

​যদি কারও অন্তরে রাসুলের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা, তাঁর আদর্শের প্রতি সম্মান এবং আল্লাহর দ্বীনের প্রতি আনুগত্য না থাকে, তবে শুধু বাহ্যিক লেবাস তাকে প্রকৃত আশেক বানাতে পারে না। ইলমুদ্দিনের মতো সাধারণ পোশাকধারী মানুষের বুকেও যে ঈমানের কিয়ামত তৈরি হতে পারে, ইতিহাস তার সাক্ষী।

​বর্তমান পৃথিবীতে কেমন "আশেকে রাসুল" প্রয়োজন?

​আজকের পৃথিবী ১৯২৩ সালের চেয়ে অনেক ভিন্ন। এখন যুদ্ধের ময়দান বা প্রতিবাদের ভাষা বদলে গেছে। আজকেও বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রিয় নবীজি (সা:)-এর অবমাননা করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয় কী? আজ আমাদের কেমন ইলমুদ্দিনের প্রয়োজন?

১. জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই:

আজকের দিনে নবীজির অবমাননা সাধারণত বই, সিনেমা, সোশ্যাল মিডিয়া বা কার্টুনের মাধ্যমে করা হয়। এর সঠিক জবাব দিতে হলে আমাদের আধুনিক জ্ঞান, যুক্তি এবং শক্তিশালী লেখনী দিয়ে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরতে হবে।

২. রাসুলের আখলাকের জীবন্ত প্রতিফলন:

আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন রাসুলুল্লাহ (সা:)-এর সুমহান চরিত্র (আখলাক) আমাদের নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করা। আমাদের সততা, দয়া, ক্ষমাশীলতা এবং পরোপকারী মনোভাব দেখে যেন অমুসলিমরাও বলতে বাধ্য হয়—"যার অনুসারীরা এত সুন্দর, সেই নবী কত না মহান ছিলেন!"

৩. ধৈর্য ও আইনি সচেতনতা:

রাসুলুল্লাহ (সা:) নিজে মক্কার জীবনে কাফেরদের দ্বারা চরমভাবে লাঞ্ছিত হয়েও অধিকাংশ সময় ধৈর্য ধরেছেন এবং তাদের হেদায়তের জন্য দোয়া করেছেন। আবেগ থাকা ভালো, তবে সেই আবেগ যেন উগ্রতায় রূপ না নেয়। যেকোনো বিষয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার চেয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বজায় রেখে সুশৃঙ্খলভাবে প্রতিবাদ করাই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা।

​উপসংহার

​গাজী ইলমুদ্দিনের শাহাদাত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রাসুলের ভালোবাসা এক পরম নিয়ামত, যা আল্লাহ যেকোনো সাধারণ মানুষের হৃদয়েও ঢেলে দিতে পারেন। আসুন, আমরা যেমন আমাদের পোশাকে ও লেবাসে নবীজির সুন্নাহকে ধারণ করার চেষ্টা করব, ঠিক তেমনই আমাদের অন্তরে ইলমুদ্দিনের মতো নিখাদ মহব্বত এবং কর্মজীবনে রাসুলুল্লাহ (সা:)-এর সুন্দর চরিত্র ফুটিয়ে তুলব। তবেই আমরা হব প্রকৃত অর্থে 'আশেকে রাসুল'।

আপনার ওয়েবসাইটের রিডারদের জন্য এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো? কমেন্ট করে আপনার মূল্যবান মতামত জানান!

0 Comments

Post a Comment

Post a Comment (0)

Previous Post Next Post