কবি কাজী নজরুল ইসলামের পূর্ণাঙ্গ জীবনী

 

কাজী নজরুল ইসলামের জীবনী


ভূমিকা

​বাঙালি জাতির অহংকার, সাম্যের প্রতীক এবং আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ, সাংবাদিক, সম্পাদক এবং মহান বিপ্লবী। পরাধীন ভারতের শৃঙ্খল ভাঙার জন্য তার কলম ছিল কামানের গোলার মতো শক্তিশালী। শোষিত মানুষের পক্ষে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার উচ্চকণ্ঠ তাকে 'বিদ্রোহী কবি' হিসেবে অমর করে রেখেছে। মাত্র ২২ বছরের সৃজনশীল জীবনে তিনি যা দিয়ে গেছেন, তা হাজার বছরেও ফুরিয়ে যাওয়ার নয়।

জন্ম ও শৈশব: দুখু মিয়ার সংগ্রাম

​১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪শে মে (১১ই জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন নজরুল। তার পিতার নাম কাজী ফকির আহমেদ এবং মাতার নাম জাহেদা খাতুন। নজরুলের শৈশব ছিল অত্যন্ত দারিদ্র্যপীড়িত। আট বছর বয়সে পিতাকে হারানোর পর অভাবের তাড়নায় তিনি লেটোর দলে যোগ দেন। সেখানে গান লিখে এবং অভিনয় করে তার সাহিত্য প্রতিভার প্রাথমিক বিকাশ ঘটে। এই কষ্টের জীবনের কারণেই তার ডাকনাম রাখা হয়েছিল 'দুখু মিয়া'

শিক্ষা জীবন ও রুটির দোকানে কাজ

​নজরুলের পড়াশোনা শুরু হয়েছিল গ্রামের মক্তবে। কিন্তু অভাব তাকে স্থির হতে দেয়নি। তিনি আসানসোলের এক রুটির দোকানে মাসিক এক টাকা বেতনে কাজ শুরু করেন। সেখানেই তার সাথে পরিচয় হয় পুলিশ দারোগা রফিজউল্লাহর, যিনি নজরুলকে ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিরামপুর স্কুলে ভর্তি করে দেন। তবে ভবঘুরে স্বভাবের কারণে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় বেশিদিন মন দিতে পারেননি।

সৈনিক জীবন: প্রথম মহাযুদ্ধের প্রভাব

​১৯১৭ সালে নজরুল ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনে যোগ দিয়ে করাচি সেনানিবাসে চলে যান। এই সৈনিক জীবন তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেখানে থেকেই তিনি ফার্সি সাহিত্য এবং শাস্ত্রীয় সংগীতের চর্চা করেন। সৈনিক থাকাকালীন তার প্রথম লেখা 'বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী' প্রকাশিত হয়। ১৯২০ সালে পল্টন ভেঙে দিলে তিনি কলকাতায় ফিরে পুরোদমে সাহিত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন।

বিদ্রোহী কবি ও 'বিদ্রোহী' কবিতা

​১৯২২ সালে তার বিখ্যাত কবিতা 'বিদ্রোহী' প্রকাশিত হওয়ার পর পুরো ভারতবর্ষে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। তিনি ঘোষণা করলেন—

"বল বীর, বল উন্নত মম শির..." এই একটি কবিতাই তাকে রাতারাতি বিখ্যাত করে তোলে। ব্রিটিশ সরকার তাকে নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তার রাজদ্রোহিতামূলক রচনার জন্য তাকে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়েছে। কিন্তু জেলখানাতেও তিনি 'শিকল পরা ছল' গেয়ে বন্দীদের উদ্বুদ্ধ করেছেন।


সাম্যবাদ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা

​নজরুলের চরিত্রের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তার অসাম্প্রদায়িকতা। তিনি মানুষের মধ্যে কোনো বিভেদ মানতেন না। তিনি লিখেছেন, "গাহি সাম্যের গান— যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান।" তিনি যেমন 'বিদ্রোহী' ছিলেন, তেমনি ছিলেন প্রেমের কবি। একদিকে তিনি লিখেছেন অসংখ্য ইসলামী হামদ ও নাত, অন্যদিকে লিখেছেন শ্যামাসঙ্গীত ও কীর্তন। তার এই বিশালতা তাকে সকল ধর্মের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।

নজরুল গীতি ও সংগীত প্রতিভা

​নজরুল কেবল কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অসামান্য সুরকার। তিনি প্রায় ৩০০০-এর বেশি গান রচনা করেছেন, যা আজ 'নজরুল গীতি' নামে পরিচিত। ঠুমরি, গজল থেকে শুরু করে দেশাত্মবোধক গান— সবখানেই তার ছিল অবাধ বিচরণ। তার প্রবর্তিত গজল গান বাংলা সংগীতকে এক নতুন উচ্চতা দিয়েছে।

সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক তৎপরতা

​নজরুল 'ধূমকেতু', 'লাঙ্গল' এবং 'নবযুগ' পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই পত্রিকাগুলোর মাধ্যমে তিনি ব্রিটিশ শোষণের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে জাগ্রত করেছেন। তিনি ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার প্রথম দাবিদারদের মধ্যে একজন ছিলেন।

পারিবারিক জীবন ও অসুস্থতা

​নজরুল ১৯২৪ সালে প্রমীলা দেবীকে বিবাহ করেন। তাদের দাম্পত্য জীবন ছিল সুখ-দুঃখের মিশ্রণ। দুর্ভাগ্যবশত, ১৯৪২ সালে মাত্র ৪৩ বছর বয়সে নজরুল এক রহস্যময় রোগে আক্রান্ত হয়ে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। দীর্ঘ ৩৪ বছর তিনি এই অসহ্য নীরবতার মধ্যে অতিবাহিত করেন।

বাংলাদেশে আগমন ও জাতীয় কবির মর্যাদা

​১৯৭২ সালে স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে কবিকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন এবং তাকে বাংলাদেশের জাতীয়তা প্রদান করা হয়। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক 'ডি.লিট' ডিগ্রি প্রদান করে। তাকে বাংলাদেশের 'জাতীয় কবি' হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

ওফাত বা মহাপ্রয়াণ

​১৯৭৬ সালের ২৯শে আগস্ট (১২ই ভাদ্র) ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে (বর্তমান বিএসএমএমইউ) এই মহান কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার ইচ্ছানুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। আজও তার কবরের পাশ দিয়ে যাতায়াতকারী মানুষ তার সেই গানের সুর শুনতে পায়—

"মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই..."


উপসংহার

​কাজী নজরুল ইসলাম কেবল একজন কবি নন, তিনি বাঙালির চেতনার নাম। দারিদ্র্য ও অসুস্থতা তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। তার জীবন থেকে আমাদের শেখার আছে অদম্য সাহস এবং মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। আধুনিক বাঙালির আত্মপরিচয় নির্মাণে নজরুলের অবদান অনস্বীকার্য।

হজরত মুহাম্মাদ সা: জীবনী 

0 Comments

Post a Comment

Post a Comment (0)

Previous Post Next Post