হরমুজ প্রণালী কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

 

Strait of Hormuz)।


ভূমিকা

​বিশ্ব মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায় পারস্য উপসাগরের মুখে খুব সরু একটি জলপথ। এই সামান্য সরু পথটিই নিয়ন্ত্রণ করছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বড় অর্থনীতির চাকা। এর নাম 'হরমুজ প্রণালী' (Strait of Hormuz)। এটি কেবল একটি সমুদ্রপথ নয়, বরং এটি বিশ্বের তেলের বাজারের হৃৎপিণ্ড। এই পথটি দিয়ে প্রতিদিন যে পরিমাণ জ্বালানি তেল পার হয়, তা দিয়ে বিশ্বের মোট চাহিদার এক-পঞ্চমাংশ মেটানো সম্ভব। আজ আমরা জানব কেন এই সরু পথটি নিয়ে সারা বিশ্বের ঘুম হারাম হয়ে থাকে।

ভৌগোলিক অবস্থান ও গঠন

​হরমুজ প্রণালী পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরকে একে অপরের সাথে সংযুক্ত করেছে। এর উত্তর দিকে রয়েছে ইরান এবং দক্ষিণ দিকে রয়েছে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত

  • দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ: এই প্রণালীর দৈর্ঘ্য প্রায় ১০০ মাইল। এর সবচেয়ে সংকীর্ণ বা সরু অংশটির প্রস্থ মাত্র ২১ মাইল (৩৩ কিমি)।
  • শিপিং লেন: জাহাজ চলাচলের জন্য মাত্র ২ মাইল চওড়া একটি রাস্তা (Shipping Lane) ব্যবহার করতে হয়। অর্থাৎ বিশ্বের বিশাল বিশাল তেলের ট্যাংকারগুলো খুব সরু একটি গলি দিয়ে যাতায়াত করে।

কেন এটি তেলের 'মহাসড়ক'?

​আরব দেশগুলোর (সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, কাতার ও আমিরাত) তেলের প্রধান খনিগুলো এই পারস্য উপসাগরেই অবস্থিত। এই দেশগুলো থেকে যখন তেলের ট্যাংকার এশিয়া, ইউরোপ বা আমেরিকায় যায়, তখন তাদের এই হরমুজ প্রণালী পার হওয়া ছাড়া আর কোনো কার্যকর বিকল্প নেই।

  • পরিসংখ্যান: প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে পার হয়।
  • এশিয়ার নির্ভরতা: চীন, ভারত, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার তেলের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে এই পথ দিয়ে। তাই এই পথ বন্ধ হওয়া মানে এশিয়ার বড় বড় দেশগুলো অচল হয়ে যাওয়া।

ইরানের একচ্ছত্র আধিপত্য ও সামরিক কৌশল

​সাগরটা মোটামুটি বড় হলেও ইরান কেন এখানে এত শক্তিশালী? এর উত্তর হলো ইরানের ভৌগোলিক সুবিধা এবং তাদের সামরিক স্ট্র্যাটেজি।

১. পাহাড়ী উপকূল: ইরানের উপকূলীয় এলাকা উঁচু পাহাড় দিয়ে ঘেরা। সেখানে ইরান কয়েক হাজার মিসাইল ও ড্রোন মোতায়েন করে রেখেছে।

২. ছোট বোট ও মাইন: ইরানের নৌবাহিনী ছোট ছোট স্পিডবোটে অভ্যস্ত। সরু পথে বড় যুদ্ধজাহাজের চেয়ে ছোট বোট বেশি কার্যকর। এছাড়া ইরান যদি সাগরে কিছু 'নেভাল মাইন' (Sea Mines) ছেড়ে দেয়, তবে কোনো জাহাজ বীমা কোম্পানি ওই রাস্তায় জাহাজ চালানোর অনুমতি দেবে না।

আরব দেশ ও আমেরিকার অবস্থান

​দুবাই বা সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমান এই প্রণালীর অপর প্রান্তে থাকলেও তারা ইরানের মতো আগ্রাসী হতে পারে না।

  • অর্থনৈতিক ঝুঁকি: আরব দেশগুলো চায় শান্তি, কারণ যুদ্ধ লাগলে তাদের তেল বিক্রি বন্ধ হয়ে যাবে।
  • আমেরিকার উপস্থিতি: হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমেরিকার ৫ম নৌবহর (5th Fleet) বাহরাইনে অবস্থান করে। ইরান এবং আমেরিকার মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হলে এই এলাকাটি রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়।

যদি কখনো হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যায়?

​কল্পনা করুন, ইরান যদি কোনো কারণে একদিনের জন্য এই পথটি বন্ধ করে দেয়, তবে কী হবে?

  • তেলের দাম: আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক রাতেই ডাবল হয়ে যেতে পারে।
  • বিশ্ব মন্দা: তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়বে, ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসের দাম বেড়ে বিশ্বজুড়ে চরম অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেবে।
  • পরিবহন সংকট: বিমান থেকে শুরু করে পণ্যবাহী ট্রাক—সবই জ্বালানির অভাবে স্থবির হয়ে যাবে।

বিকল্প রাস্তার অভাব

​অনেকে বলতে পারেন, অন্য কোনো রাস্তা নেই? উত্তর হলো—বিকল্প রাস্তা খুবই সীমিত। সৌদি আরব বা আমিরাতের লোহিত সাগর দিয়ে তেল পাঠানোর পাইপলাইন আছে, কিন্তু সেগুলোর ক্ষমতা হরমুজ প্রণালীর তুলনায় খুবই কম। এই কারণেই হরমুজ প্রণালীকে কোনোভাবেই অবহেলা করার সুযোগ নেই।

উপসংহার

​হরমুজ প্রণালী কেবল জল আর সাগরের সীমানা নয়; এটি হলো বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতার লড়াইয়ের মঞ্চ। ইরান, আরব দেশ এবং আমেরিকার মধ্যে এই পথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যে টানাটানি চলে, তার ওপরই নির্ভর করে আপনার গাড়ির জ্বালানি বা বাজারের পণ্যের দাম। তাই আগামী দিনেও বিশ্ব রাজনীতিতে এই সরু পথটিই হবে সবচেয়ে আলোচিত স্থান।

Read in English,,

0 Comments

Post a Comment

Post a Comment (0)

Previous Post Next Post