পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (ﷺ): একটি তাত্ত্বিক ও দালীলিক পর্যালোচনা
ভূমিকা
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (ﷺ) মুসলিম উম্মাহর জন্য এক মহিমান্বিত ও আনন্দময় দিন। 'ঈদ' মানে আনন্দ, 'মিলাদ' মানে জন্ম এবং 'নবী' বলতে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (ﷺ)-কে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, ঈদে মিলাদুন্নবী (ﷺ) শব্দের অর্থ হলো—নবীজির শুভাগমন উপলক্ষে আনন্দ উদযাপন করা। শরীয়তের দৃষ্টিতে এই দিনটি পালন করা কেবল জায়েজই নয়, বরং এটি মুমিনের জন্য মহব্বতের বহিঃপ্রকাশ। আজ আমরা পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ এবং ইমামদের ব্যাখ্যার আলোকে এর বৈধতা ও গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
১. মিলাদুন্নবী (ﷺ)-এর সংজ্ঞা ও তাৎপর্য
বিখ্যাত আলেম আল্লামা মোল্লা আলী কারী (রহ.) তাঁর 'আল মাওরিদুর রাবী' কিতাবে মিলাদের পারিভাষিক সংজ্ঞায় বলেন:
"মিলাদ শরীফ হলো নবীজির জন্মবৃত্তান্ত, তাঁর মোজেজা ও সীরাত আলোচনার জন্য একত্রিত হওয়া, তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম পেশ করা এবং খাবারের আয়োজন করে মুমিনদের অন্তরে আনন্দ দান করা।"
বিখ্যাত তাবেঈ হযরত হাসান বসরী (রহ.) এই দিনের মাহাত্ম্য বর্ণনা করে বলেন— "যদি আমার কাছে উহুদ পাহাড় সমপরিমাণ সোনা থাকত, তবে আমি তা মিলাদুন্নবী (ﷺ) মাহফিলে খরচ করতাম।" (সূত্র: আন নেয়মাতুল কুবরা আলাল আলাম)।
২. পবিত্র কুরআন থেকে মিলাদুন্নবী (ﷺ) পালনের দলিল
দলিল ১: আম্বিয়ায়ে কেরামের মাহফিল
সূরা আল-ইমরানের ৮১-৮২ নং আয়াতে আল্লাহ পাক সকল নবীগণের কাছ থেকে একটি অঙ্গীকার নিয়েছিলেন। সেখানে নবীজির আগমনের সংবাদ দেওয়া হয়েছিল এবং সকল নবী উপস্থিত ছিলেন। এটিই ছিল সৃষ্টির প্রথম মিলাদ মাহফিল, যেখানে বক্তা ছিলেন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা।
দলিল ২: আল্লাহর নেয়ামতে আনন্দ প্রকাশের নির্দেশ
আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন— "হে হাবীব! আপনি বলুন, আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত প্রাপ্তিতে তারা যেন আনন্দ প্রকাশ করে। এটি তাদের সমস্ত ধন-দৌলত সঞ্চয় করা অপেক্ষা উত্তম।" (সূরা ইউনুস: ৫৮)।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতে, এখানে 'রহমত' দ্বারা স্বয়ং নবীজি (ﷺ)-কে বোঝানো হয়েছে। যেহেতু তিনি 'রাহমাতুল্লিল আলামিন', তাই তাঁর আগমনে খুশি হওয়া আল্লাহর নির্দেশ।
দলিল ৩: নেয়ামত প্রাপ্তির দিনকে 'ঈদ' ঘোষণা
হযরত ঈসা (আ.) আকাশ থেকে খাদ্যভর্তি খাঞ্চা নাজিলের দিনটিকে পরবর্তী সবার জন্য 'ঈদ' বা আনন্দোৎসব হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন (সূরা মায়েদা: ১১৪)। যদি সাধারণ খাবারের জন্য ঈদ হতে পারে, তবে সৃষ্টির সেরা নেয়ামত নবীজি (ﷺ)-এর আগমনের দিনটি কত বড় ঈদ হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
৩. সুন্নাহ ও হাদিস থেকে মিলাদুন্নবী (ﷺ)-এর প্রমাণ
- নবীজির নিজের জন্মদিন পালন: সহীহ মুসলিমের ২৬৪০ নং হাদিসে এসেছে, নবীজিকে সোমবারের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন— "এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি।" অর্থাৎ, তিনি নিজের জন্মদিনে ইবাদত ও শুকরিয়ার মাধ্যমে তা পালন করতেন।
- সাহাবায়ে কেরামের আমল: হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) নিজ ঘরে নবীজির জন্মবৃত্তান্ত আলোচনা করে আনন্দ করছিলেন। নবীজি তা দেখে খুশি হয়ে বলেছিলেন— "তোমাদের সবার জন্য আমার শাফায়াত অবধারিত হয়ে গেল।" (সূত্র: আত-তানভীর ফী মওলেদী বশীরিন নাযীর)।
- কবিতার মাধ্যমে মিলাদ: হযরত হাস্সান ইবনে সাবিত (রা.) মিম্বরে দাঁড়িয়ে কবিতার মাধ্যমে নবীজির জন্মের প্রশংসা ও গুণগান গাইতেন (দিওয়ান-ই হাস্সান)।
৪. মিলাদুন্নবী (ﷺ) পালনের উপকারিতা
মিলাদুন্নবী পালনের আধ্যাত্মিক সুফল অপরিসীম। এমনকি আবু লাহাবের মতো কাফেরও নবীজির জন্মের সংবাদ শুনে খুশি হয়ে দাসী আজাদ করায় প্রতি সোমবার তার কবরের আজাব হালকা করে দেওয়া হয় (বুখারী ও ফাতহুল বারি)। একজন কাফের যদি খুশি হয়ে উপকার পায়, তবে একজন মুমিন মুসলমান মহব্বত নিয়ে এই দিন পালন করলে তার প্রতিদান কত বিশাল হবে!
৫. বর্তমান সময়ে মিলাদুন্নবী (ﷺ) পালনের পদ্ধতি
ইসলামে ভালো কোনো কাজের প্রচলন করাকে 'বিদআতে হাসানা' বা উত্তম কাজ বলা হয় (সহীহ মুসলিম: ১০১৭)। বর্তমান যুগে মাহফিল করা, জশনে জুলুস (র্যালি) বের করা এবং তাবাররুক বিতরণ করা এই উত্তম কাজেরই অন্তর্ভুক্ত।
এই দিনে আমাদের করণীয়:
- বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পাঠ করা।
- নবীজির সীরাত বা জীবনী আলোচনা করা।
- রোজা রাখা এবং দান-খয়রাত করা।
- অভাবী মানুষদের খাবার খাওয়ানো।
- ঘরবাড়ি ও মসজিদ আলোকসজ্জা করা এবং আনন্দ প্রকাশ করা।
বর্জনীয় কাজ:
- গান-বাজনা বা শরিয়ত বিরোধী কোনো কাজ করা।
- আতশবাজি বা পটকা ফাটানো।
- জোর করে চাঁদা আদায় করা।
- অতিরিক্ত অপচয় করা।
উপসংহার
ঈদে মিলাদুন্নবী (ﷺ) পালন করা কোনো মনগড়া প্রথা নয়, বরং এটি কুরআন ও সুন্নাহ সমর্থিত একটি আমল। এটি মুমিনদের অন্তরে নবীপ্রেম জাগ্রত করে এবং উম্মাহর মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলে। আসুন, আমরা যথাযথ আদব ও শরিয়তের সীমার মধ্যে থেকে এই মহান নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করি।

Post a Comment