প্রবাসীর কষ্টের ঈদ কিবাভে কাটে

প্রবাসীর কষ্টের ঈদ কিবাভে কাটে



​প্রবাসীর কষ্টের ঈদ: হাজার মাইল দূরে এক বুক দীর্ঘশ্বাস ও একাকীত্বের গল্প

​পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ একটি ছোট দেশ হলেও এর বিশাল এক জনগোষ্ঠী ছড়িয়ে আছে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে। কেউ মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত মরুভূমিতে, কেউ ইউরোপের কনকনে ঠান্ডায়, আবার কেউ এশিয়ার উন্নত শহরগুলোতে দিনরাত পরিশ্রম করছেন। তাদের এই পরিশ্রমের একমাত্র লক্ষ্য—দেশে থাকা পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো। কিন্তু এই হাসি ফোটাতে গিয়ে তারা নিজেরা কতটা ত্যাগ স্বীকার করেন, তার সবথেকে বড় প্রমাণ পাওয়া যায় ঈদের দিনে। প্রবাসীর ঈদ মানেই এক অদ্ভুত কষ্টের মহাকাব্য।

​১. ঈদের চাঁদ আর স্মৃতির দহন

​বাংলাদেশে যখন ঈদের চাঁদ দেখা যায়, তখন পাড়ায় পাড়ায় আনন্দধ্বনি ওঠে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা নতুন জামা পরে ছোটাছুটি করে। কিন্তু প্রবাসে? প্রবাসীর কাছে ঈদের চাঁদ মানেই স্মৃতির জানালার কপাট খুলে যাওয়া। মরুভূমির আকাশে বা বিদেশের যান্ত্রিক শহরে যখন চাঁদ ওঠে, তখন প্রবাসীর মনে পড়ে যায় ফেলে আসা সেই দিনগুলোর কথা। মায়ের হাতের সেমাই, বাবার সাথে ঈদগাহে যাওয়া, আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা—সবকিছু যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কিন্তু বাস্তবে পাশে থাকে শুধু শূন্যতা।

​২. ঈদের সকালে একাকীত্ব

​ঈদের সকালে যখন বাংলাদেশে ঘরে ঘরে রান্নার সুঘ্রাণ ছড়ায়, তখন প্রবাসীর ঘুম ভাঙে হয়তো ডিউটিতে যাওয়ার অ্যালার্ম শুনে। অনেক সময় ঈদের দিনও তাদের কাজ করতে হয়। নামাজ পড়ার জন্য হয়তো মাত্র কয়েক ঘণ্টার ছুটি মেলে। কোনোমতে ঈদের নামাজ পড়ে যখন তারা রুমে ফেরেন, তখন চারপাশটা যেন আরও বেশি নিঝুম হয়ে যায়। চারদিকে সবাই অপরিচিত, সবারই চোখেমুখে ক্লান্তি। নিজের হাতে হয়তো একটু নুডলস বা সাধারণ কিছু রান্না করে খেয়েই তারা আবার কাজে লেগে পড়েন। যেখানে নিজের মায়ের হাতের রান্না ছাড়া ঈদের কথা ভাবাই যায় না, সেখানে প্রবাসীরা এক প্লেট সাধারণ খাবার খেয়েই ঈদের দিন পার করে দেন।

​৩. ভিডিও কলে হাসিমুখে লুকানো চোখের জল

​প্রবাসীর ঈদের সবথেকে কষ্টের মুহূর্ত হলো পরিবারের সাথে ভিডিও কলে কথা বলা। স্ক্রিনের ওপারে মা কাঁদছেন, স্ত্রী নতুন শাড়ি পরে মন খারাপ করে বসে আছেন, আর ছোট সন্তানটি জিজ্ঞেস করছে, "বাবা, তুমি কবে আসবে?"। এই প্রশ্নটির উত্তর প্রবাসীর কাছে থাকে না। সে কেবল হাসিমুখে বলে, "আমি ভালো আছি, তোমরা আনন্দ করো।" কিন্তু ফোনের ওপারে হাসি ধরে রাখলেও ফোনটা রাখার পর বালিশে মুখ গুঁজে যে কান্না তারা কাঁদেন, তার সাক্ষী কেবল ওই দেয়ালগুলোই। নিজের কষ্টটা পরিবারের কাছে গোপন রাখাটাই যেন প্রবাসীর সবথেকে বড় বীরত্ব।

​৪. ত্যাগের ঈদ, কষ্টের ঈদ

​প্রবাসীরা কেন এই কষ্ট সহ্য করেন? কারণ তারা চান তাদের পরিবার ভালো থাকুক। ঈদের আগে যখন প্রবাসী ভাইটি তার বেতনের সিংহভাগ টাকা দেশে পাঠিয়ে দেন যাতে মা নতুন কাপড় কিনতে পারেন, ছোট বোনটা সাজতে পারে বা স্ত্রী ভালো কিছু রান্না করতে পারে—তখনই তার আসল ঈদ হয়ে যায়। নিজের জন্য হয়তো একটা সাধারণ পাঞ্জাবিও কেনেন না, কিন্তু পরিবারের সবার নতুন জামার ছবি দেখে তিনি তৃপ্তির হাসি হাসেন। এই ত্যাগের কোনো তুলনা হয় না।

​৫. প্রবাস জীবনের রূঢ় বাস্তবতা

​অনেক সময় দেখা যায়, ঈদের দিনও অনেক প্রবাসী ভাই অসুস্থ অবস্থায় রুমে একা পড়ে থাকেন। সেবা করার মতো কেউ থাকে না। আবার অনেকের হয়তো থাকার বৈধ কাগজ (আকামা) নেই, তারা ভয়ে বাইরে বের হতে পারেন না। এই রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির মধ্যে তাদের ঈদ কাটাতে হয়। উৎসবের আমেজ তাদের কাছে কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ মাত্র। বিদেশের মাটিতে ঈদ মানেই হলো আরও একটি দিন অতিবাহিত করা, পরিবারের কাছে ফেরার জন্য আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া।

​৬. প্রবাসীদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব

​আমরা যারা দেশে থাকি, আমরা কি কখনো ভেবেছি এই প্রবাসীদের কষ্টের কথা? তারা টাকা পাঠান বলে আমাদের ঈদ আনন্দময় হয়। কিন্তু আমরা অনেক সময় তাদের কেবল টাকার মেশিন মনে করি। ঈদের দিনে প্রবাসী ভাইটিকে ফোন দিয়ে কেবল কত টাকা পাঠিয়েছে তা জিজ্ঞেস না করে, তার শরীরের খোঁজ নিন। তাকে বলুন যে আমরা তাকে খুব মিস করছি। আপনার একটি ছোট ফোন কল তার বিদেশের একাকীত্বে কিছুটা হলেও সান্ত্বনা দেবে।

​উপসংহার

​প্রবাসীর ঈদ মানে শুধু সেমাই আর নতুন জামা নয়; প্রবাসীর ঈদ মানে তপ্ত মরুভূমির রোদে পুড়ে অর্জিত রেমিট্যান্স, যা দিয়ে দেশের অর্থনীতি সচল থাকে। প্রবাসীর ঈদ মানে হাসিমুখে বলা "আমি ভালো আছি" নামক এক পরম মিথ্যে কথা। সালাম জানাই পৃথিবীর সকল প্রান্তে থাকা সেই সব বীর যোদ্ধাদের, যারা নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে দিনরাত লড়ে যাচ্ছেন। আল্লাহ প্রতিটি প্রবাসীর ঈদকে আনন্দময় করে দিন এবং তাদের দ্রুত পরিবারের কাছে ফিরে আসার তৌফিক দান করুন।

রিয়াদের মিসাইল হামলা 

0 Comments

Post a Comment

Post a Comment (0)

Previous Post Next Post